২০ অগাস্ট ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ১২:৫৮:৩৩ অপরাহ্ন
৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে আজ ভোট, কাল বঙ্গভবনে শপথ
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০-০৮-২০২৬
৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে আজ ভোট, কাল বঙ্গভবনে শপথ

১৯৯১ থেকে ২০২৬; দীর্ঘ ৩৫ বছর পর দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আজ বৃহস্পতিবার সরাসরি ভোটাভুটি দেখবেন দেশের মানুষ। বাংলাদেশে সংসদীয় ব্যবস্থা ফেরার পর রাষ্ট্রপতি পদে সর্বশেষ ভোট হয়েছিল ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর। আর দ্বিতীয়বারের মতো প্রত্যক্ষ নির্বাচন হতে যাচ্ছে আজ। ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন যারা দেখেননি, তাদের জন্য আজ জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদকক্ষে এই ভোটাভুটি প্রত্যক্ষ করার ঘটনা হবে নতুন এক অভিজ্ঞতা।


দীর্ঘ ৩৫ বছর পর হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষে গতকাল বুধবার সংসদ ভবনে সরকারি দলের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আজ ঐতিহাসিক একটি দিন। অনেক মূল্য দিয়ে আমরা আজ এ জায়গায় এসেছি।’ এজন্য তিনি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন।


বিএনপির সংসদীয় দলের সভা শেষে সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেছেন, ‘দেশের মানুষ আবার প্রত্যক্ষ করবে কীভাবে ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। একটা ইতিহাসের মাহেন্দ্রক্ষণ তৈরি হবে, ইতিহাসের গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু হবে।’ এই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ‘নির্বাচনি কর্তা’ ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনও গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ায় এটি একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন। সাবেক রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ এবং নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।’


আজকের ভোটের ফলাফল সবারই জানা। যেহেতু এই নির্বাচনে ভোটার শুধুমাত্র সংসদ সদস্যরা। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করা বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হতে যাচ্ছেন দেশের ২৩তম রাষ্টপ্রতি। একইসঙ্গে ৩৫ বছর পর দেশ পেতে যাচ্ছে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত একজন রাষ্ট্রপতি। মির্জা ফখরুলের প্রতিদ্বন্দ্বী সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য মনোনীত লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। বিভক্তি ভোটের এই নির্বাচনে দুই প্রার্থীর কে কত ভোট পাবেন- সেটিও মোটামুটি সবার জানা। বাকি সবই মূলত আনুষ্ঠানিকতা।


৫০টি সংরক্ষিত আসনসহ বর্তমান সংসদের সদস্য সংখ্যা ৩৪৯ (একটি আসনের গেজেট প্রকাশ হয়নি)। সেকারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ব্যালটও থাকছে ৩৪৯টি। আর ব্যালট বাক্স থাকবে তিনটি। তবে, মালয়েশিয়ায় চিকিত্সাধীন বিএনপি দলীয় এমপি মির্জা আব্বাসের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারা না পারা নিয়ে নিশ্চিত কিছু জানা যায়নি। সংসদকক্ষে আজ দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ শেষে সেখানেই ভোটের ফলাফল ঘোষণা করবেন এই ভোটের ‘নির্বাচনি কর্তা’ ও সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন। ফল ঘোষণার পর আজই গেজেট প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এরপর আগামীকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ নেবেন নতুন রাষ্ট্রপতি।


প্রসঙ্গত, ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তত্কালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাসের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। সেই নির্বাচনে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। আর বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। এরপর বিগত সাতবারই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন হতে যাচ্ছে আজ। দুটি দৃষ্টান্তই বিএনপি সরকারের আমলে।


চলতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিএনপির আসন ২১০টি। জামায়াতে ইসলামী ৬৮ আসন পেয়ে বিরোধী দলে বসেছে। দলটির নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। আনুপাতিক হারে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনেও বিএনপি ও মিত্রদের সদস্য বিরোধীদলের চেয়ে বেশি। ফলে, ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। এটা খুবই সরল অংক। আজ ভোট গণনা থেকে ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও সংসদ টেলিভিশন। গণনা শেষে সংসদকক্ষেই ফলাফল ঘোষণা করবেন সিইসি।


রাষ্ট্রপতি পদে আজ ভোট দেবেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ সংসদ সদস্যরা। বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মির্জা ফখরুলও ভোট দিতে পারবেন। কারণ তিনিও সংসদ সদস্য। তবে, অলি আহমদ যেহেতু সংসদ সদস্য নন, তাই তিনি ভোট দিতে পারবেন না। আর মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণের সঙ্গেসঙ্গেই তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়ে যাবে।


দল যে সম্মান ও দায়িত্ব দিয়েছে, জীবন দিয়ে হলেও তা রক্ষা করবো;


দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস করবো না: মির্জা ফখরুল


আজ ভোটের আগে গতকাল বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় এমপি হিসেবে বিদায়ী বক্তব্য রাখেন রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বক্তব্য দিতে গিয়ে বারবার কাঁদের তিনি। নেতা-কর্মীদের কাছে দোয়া চেয়ে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।


সভায় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি স্বাগত বক্তব্য দেন। তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংসদ সদস্যদের বিস্তারিত ধারণা দেন এবং মির্জা ফখরুল ইসলামের পক্ষে ভোট চান। চিফ হুইপের পর বক্তব্য দিতে দাঁড়ান বিএনপির সদ্য বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বক্তব্যের শুরুতেই আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। স্মরণ করেন বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। কৃতজ্ঞতা জানান দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিও।


বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘ দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, দায়িত্ব পালনকালে তার কোনো ভুল-ভ্রান্তি হয়ে থাকলে কিংবা অজান্তে কারো মনে আঘাত দিয়ে থাকলে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী। দল তাকে যে সম্মান ও দায়িত্ব দিয়েছে, জীবন দিয়ে হলেও তিনি সেই সম্মান রক্ষা করবেন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করবেন না। বঙ্গভবনে যাওয়ার পর সহকর্মীদের মিস করবেন উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল সবার কাছে দোয়া চান। সভায় অংশ নেওয়া একাধিক সংসদ সদস্য জানান, কয়েক মিনিটের বক্তব্যে অন্তত চার-পাঁচবার কেঁদেছিলেন মির্জা ফখরুল। এতে সভায় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। প্রধানমন্ত্রীও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।


দীর্ঘদিন পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ায় ঐতিহাসিক নির্বাচন,


অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ভোট সম্পন্ন হবে: সিইসি


গতকাল আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের নিজ দপ্তরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রাতিষ্ঠানিক কিছু ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে সিইসি ও ‘নির্বাচনি কর্তা’ এ এম এম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, ১৯৯১ সালের পর আবারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এখানে প্রাতিষ্ঠানিক কিছু ঘাটতি রয়েছে। কারণ দীর্ঘ ৩৫ বছর পর এই নির্বাচন হচ্ছে। আর এই নির্বাচন আয়োজন আমরা কিংবা সংসদ সচিবালয়ও অভ্যস্ত নই। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনে প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা আমাদের সীমিত। তারপরও সম্ভাব্য সব দিক বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি নেই। পুরো প্রক্রিয়ায়ও কোনো ঘাটতি  যেন না থাকে সেই ব্যবস্থাও করেছি। সব অংশীজনের সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজন করতে আত্মবিশ্বাসী।


নাসির উদ্দিন বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজন করতে নির্বাচন কমিশনের বড় ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে না। ব্যালট ছাপানো, কাগজপত্র ও স্টেশনারিসহ কিছু আনুষঙ্গিক ব্যয় হবে। সংসদ ভবনে বৈঠক আয়োজনের ব্যয় সংসদ সচিবালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে হতে পারে।


রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ ও গণনার পদ্ধতি তুলে ধরে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও বিরোধীদলীয় নেতার ভোট দেওয়ার দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ভোট গণনার সময়ও এই সরাসরি সম্প্রচার চালু থাকবে। তবে, ফলাফল ঘোষণাকালে কোন সংসদ সদস্য কাকে ভোট দিয়েছেন, তা আলাদাভাবে প্রকাশ করা হবে না। ব্যালটের ওপর ভোটারের নাম ও প্রার্থীর নাম থাকবে। সিইসি জানান, ভোটগ্রহণের সময় সংসদ অধিবেশন কক্ষে কোনো প্রচার চালানো যাবে না। তবে সংসদ ভবনের বাইরে প্রচারণার বিষয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংক্রান্ত আইনে প্রচার-প্রচারণা নিয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।


শেয়ার করুন