০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ১১:০৪:১১ পূর্বাহ্ন
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৩-০৯-২০২৬
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

১১ বছর পর নতুন পে স্কেল ঘোষণার সিদ্ধান্ত সরকারি চাকরিজীবীদের মাঝে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই বেতন কাঠামো আগামী দুই বছরে মোট তিন ধাপে বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে এই দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং বর্তমান বাজারদরের সাথে নতুন স্কেলের সামঞ্জস্য নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এক পক্ষ একে সাধুবাদ জানালেও, অন্য পক্ষ ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতির চাপে কতটুকু সুফল পাওয়া যাবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।



সরকারি চাকরিজীবীদের একটি অংশ মনে করছেন, দীর্ঘ ১১ বছর পর বেতন কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ ইতিবাচক। এ সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে নতুন পে স্কেলে বেতন-ভাতা বাড়ানোর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি বলে তারা মনে করছেন তারা।


অন্যদিকে, নতুন বেতন কাঠামোয় সবার বেতন দ্বিগুণ হবে—এমন ধারণাও সঠিক নয় বলে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ফলে বিভিন্ন গ্রেডে প্রকৃতপক্ষে কতটা বেতন বাড়বে, তা নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে আগ্রহের পাশাপাশি অনিশ্চয়তাও রয়েছে। মূল্যস্ফীতি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা।


এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবেক উপ-উপাচার্য ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ খান সাংবাদিকদের বলেন, পে স্কেল বিভিন্ন ধাপে ধাপে বাড়ছে ও কিছু অস্পষ্টতা বা ধোঁয়াশা আছে। আগে যেমন মহার্ঘ ভাতাসহ কিছু ভাতা ছিল সেগুলোর ব্যাপারে এখনও স্পষ্ট না আসলে। সেক্ষেত্রে অনেকে আশঙ্কা করছে যে হিসেবে হয়তো ১০০% দেখাবে কিন্তু বাস্তবে এতটা বাড়বে না। যখন পে স্কেল দেয় তখন মূল্যস্ফীতির উপর একটা চাপ পড়ে। দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ে। অলরেডি আমরা দেখলাম তেলের বাজারে দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। স্বাভাবিক কারণেই এটা এত বেশি মিডিয়া কাভারেজ পায় যে, সব ধরনের মানুষের মধ্যে একটা প্রভাব পড়ে।মূল্যস্ফীতি অনেক সময় বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে এবার আমি বলব বিভিন্ন ধাপে ধাপে বৃদ্ধির ফলে সেটি অনেকটা সহনীয় হবে সেদিক থেকে।


অধ্যাপক ফরিদ বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের সেই ১৫ সালে লাস্ট স্কেল ছিল। এর মধ্যে দ্রব্যমূল্য অনেক বেড়ে গেছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বা কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান স্বাভাবিক ধরে রাখাটা কঠিন হয়ে পড়ছিল। সেদিক থেকে আমি বলব কিছুটা স্বস্তি হবে। কিন্তু এর ফলে অর্থনীতিতে ব্যাপক কোন ভূমিকা রাখবে এটি আমার কাছে খুব বেশি মনে হয় না। অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখার জন্য যেটি প্রয়োজন সেটি হচ্ছে বিনিয়োগ। বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। সেটি বাদে আসলে শুধুমাত্র বেতন ভাতা বাড়ালে বরং উল্টো কিছুটা আবার চাপ পড়বে। কারণ সরকারের যখন এই পরিচালন খাতে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে তখন অন্য খাত থেকে সেই অর্থ সরিয়ে বরাদ্দ করতে হচ্ছে বা টাকা ছাপাতে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমার মনে হয় অর্থনীতিতে এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা আছে। সামগ্রিকভাবে আমার মতামত যে, এক্ষেত্রে নেগেটিভ প্রভাবের একটা সম্ভাবনা আছে, ইতিবাচক প্রভাব পড়ার খুব বেশি সম্ভাবনা আমি দেখছি না।


মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সরকারকে আহ্বান জানিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আসিফ আহমেদ দিগন্ত সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে যুগোপযোগী। বিদ্যমান পুরনো বেতন কাঠামো অনুযায়ী চাকরিজীবীরা যে বেতন পেতেন, তা দিয়ে বর্তমান সময়ে সংসার পরিচালনা করা বেশ কঠিন। নিম্ন গ্রেডের চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে এই সংকট আরও প্রকট। তবে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টিকেও সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে বেতন বৃদ্ধি প্রকৃতপক্ষে তেমন সুফল বয়ে আনবে না।


এ বিষয়ে ৪৫ তম বিসিএসের (নন-ক্যাডার) সুপারিশপ্রাপ্ত ইন্সট্রাকটর আরফাত উদ্দিন জানান, ২০১৫ সালের পে-স্কেলের পর গত ১১ বছরে যেভাবে মূল্যস্ফীতি হয়েছে তাতে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য ছিল। তবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে অবশ্যই বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মূল্যস্ফীতির বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। অন্যথায় এই পে-স্কেল সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে গলার কাঁটা হয়ে যাবে।


সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. শামছুদ্দীন মাসুদ বলেন, নতুন পে স্কেল আমাদের দীর্ঘ দিনের কাঙ্ক্ষিত একটা বিষয়। যদিও এটা ৩ ধাপে বাস্তবায়ন করার কারণে একটু অসুবিধাই হচ্ছে। তবুও আমরা সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।


শেয়ার করুন