১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৬:৩৩:৪৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
পদ্মায় ভয়াবহ ভাঙন, আতঙ্কে সরিয়ে নিচ্ছে বসতঘর
  • আপডেট করা হয়েছে : ১১-১০-২০২৬
পদ্মায় ভয়াবহ ভাঙন, আতঙ্কে সরিয়ে নিচ্ছে বসতঘর

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের আলম খানকান্দি গ্রামে পদ্মায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত দুই মাসে পদ্মার ভাঙনে গ্রামের ৩০৩ পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে বলে জানা গেছে। নদীর তীরবর্তী আরও অনেক পরিবার ভাঙনের আতঙ্কে ঘরবাড়ি ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিচ্ছে।


স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন চললেও নদীশাসনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ফলে একের পর এক বসতবাড়ি, ফসলি জমি, সড়ক ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নদীতে বিলীন হচ্ছে।


পাউবো সূত্র জানায়, পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের পাইনপাড়া মৌজায় প্রায় ৩০ বছর আগে চর জেগে ওঠে। পরে সেখানে মানুষের বসতি গড়ে ওঠে। বর্তমানে ওই চরের ছয়টি গ্রামে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষ বসবাস করেন। চরটির দুই ও তিন নম্বর ওয়ার্ডে গত কয়েক বছর ধরে ভাঙন চলছে।


গত বছর ভাঙনে দুই নম্বর ওয়ার্ডের আহম্মদ মাঝিকান্দি, মঙ্গল মাঝিকান্দি, আলীম উদ্দিন বেপারিকান্দি ও মাঝিকান্দি গ্রামের বড় অংশ নদীতে বিলীন হয়। ওই সময় প্রায় ১ হাজার ৫০০ পরিবার গৃহহীন হয়। একই সঙ্গে ৫২ নম্বর পাইনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও রেজিয়া আমিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে চলে যায়।



চলতি বর্ষা মৌসুমে আগস্ট থেকে তিন নম্বর ওয়ার্ডের আলম খানকান্দি এলাকায় নতুন করে ভাঙন শুরু হয়। গত দুই মাসে এ এলাকায় ৩০৩ পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। এক বছরে পাইনপাড়া মৌজার অন্তত ৫ হাজার একর ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে ১২২ নম্বর আলতাফ খান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও।


গতকাল শনিবার আলম খানকান্দি গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, নদীর তীরবর্তী অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। কারও বসতভিটা ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে। তারা সড়কের ওপর কিংবা ফসলি জমিতে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছে।


১২ বছর আগে পদ্মার ভাঙনে পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের মাঝিকান্দি এলাকার বাড়ি হারিয়েছিলেন নার্গিস আক্তার। পরে নদীর উত্তর তীরের আলম খানকান্দি গ্রামে নতুন করে বসতি গড়েন। সেখানে বসতবাড়ির পাশাপাশি প্রায় ১০ বিঘা ফসলি জমি নিয়ে কৃষিকাজ করে সংসার চলছিল তার।


কিন্তু এক যুগ পর সেই ঠিকানাটিও কেড়ে নিয়েছে পদ্মা। বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে আবারও পরিবার নিয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন নার্গিস। কোথায় যাবেন, কীভাবে সংসার চালাবেন তা জানেন না তিনি।


পদ্মার তীরে বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নার্গিস বলেন, আমরা মধ্যবিত্ত কৃষি পরিবার ছিলাম। ১২ বছর আগে পদ্মার ভাঙনে সব হারিয়ে আবারও দাঁড়াইছিলাম। জমিতে চাষাবাদ করে পরিবার নিয়ে সুখে দিন কাটছিল। এখন সব গেল। বসতবাড়ি-ফসলি জমি হারিয়ে এখন নিঃস্ব। জানি না ভাগ্যে কী আছে।


নাসির কাজী ও তার স্ত্রী সুফিয়া প্রায় ২০ বছর আগে আলম খানকান্দি গ্রামে বসতি গড়েছিলেন। পাঁচ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করে চলত তাদের সংসার। গত সপ্তাহে সেই জমি ও বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হওয়ায় পাশের একটি ফসলি জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন তারা।


সুফিয়া বলেন, দুই ছেলে তাদের ভাগের জমি নিয়ে আলাদা হয়ে গেছে। পাঁচ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করেই আমরা দুজন চলছিলাম। পদ্মা নদী বসতবাড়ির সঙ্গে তাও কেড়ে নিয়েছে। এখন কোথায় যাব, কী কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করব এ চিন্তায় ঘুম আসে না।


গত ৩০ বছরে চারবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন কুদ্দুস ব্যাপারী। নদী এবার তার বসতঘরের কাছাকাছি চলে আসায় শনিবার ঘর ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিচ্ছিলেন তিনি।


কুদ্দুস বলেন, জানি না কোথায় গিয়ে দাঁড়াব। লেখার মতো আর কোনো ঠিকানা রইল না। এখন থেকে উদ্বাস্তু হয়ে গেলাম। কাগজে-কলমে হয়তো গ্রামের নাম থাকবে, কিন্তু আমাদের পা ফেলার কোনো জায়গা থাকবে না।


পাইনপাড়া চরে ২০২১ সালে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়। সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে পদ্মার তলদেশ দিয়ে চরের ছয়টি গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে ১ হাজার ২০০ গ্রাহককে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়েছিল। তবে নদীভাঙনে এরই মধ্যে প্রায় ২২ কিলোমিটার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও প্রায় ৪ কিলোমিটার পাকা সড়ক নদীতে বিলীন হয়েছে।


চরটির চারপাশেই পদ্মা নদী। নৌপথ ছাড়া এখানকার মানুষের যাতায়াতের আর কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে ভাঙনে ঘরবাড়ি হারানো পরিবারগুলোর সামনে নতুন করে আশ্রয় ও জীবিকার সংকট তৈরি হয়েছে।


স্থানীয় সূত্র জানায়, ভাঙনের শিকার ২৭৩টি পরিবারের মধ্যে চাল, ডাল ও শুকনা খাবার বিতরণ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ।


পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন খান বলেন, পদ্মা সেতুর পূর্ব দিকে পাইনপাড়া চরটি অবস্থিত। তিন-চার বছর ধরে চরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনেক অনুরোধ করেছি। কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এখন ২/৩ হাজার মানুষ ঠিকানা হারিয়ে ফেলেছে।


ভাঙন প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি স্থানীয়দের এমন অভিযোগের বিষয়ে শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মিল্টন হোসেন বলেন, আলম খানকান্দি এলাকায় ভাঙন রয়েছে, তা আমরা জানি। ওই এলাকায় ভাঙনে মানুষ ভিটেমাটি হারাচ্ছে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। চর এলাকায় নদীভাঙন রোধ বা সুরক্ষার জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জরুরি কোনো কাজ বাস্তবায়ন করছে না।


শেয়ার করুন