রাজশাহীর সাংবাদিকতা অঙ্গনের পরিচিত মুখ, রাজশাহী প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও আতাউর রহমান স্মৃতি পরিষদের সভাপতি সাইদুর রহমান মারা গেছেন।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ভোর ৪টার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
কিডনি রোগজনিত জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন প্রবীণ এ সাংবাদিক। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
তার মৃত্যুতে রাজশাহীর সাংবাদিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে সাইদুর রহমান ছিলেন শুধু একজন প্রবীণ সাংবাদিক নন, বরং ইতিহাস-ঐতিহ্য ও জনকল্যাণের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত একজন মানুষ।
সাইদুর রহমান ছিলেন একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবারের উত্তরসূরি। তার নানা ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী মাদার বখশ। রাজশাহীতে উচ্চশিক্ষার প্রসারে মাদার বখশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও বাস্তবায়নে তার অবদান সরকারি নথিতেও উল্লেখ রয়েছে।
তার বাবা আতাউর রহমানও ছিলেন রাজশাহীর রাজনীতির ইতিহাসে আলোচিত এক ব্যক্তিত্ব। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে কারাগারে অন্তরীণ অবস্থায় তিনি নির্বাচিত হন। তার মা ভাষাসৈনিক মনোয়ারা রহমান ছিলেন সমাজসেবায় নিবেদিতপ্রাণ ও আত্মত্যাগী নারী।
তবে পারিবারিক ঐতিহ্যকে শুধু স্মৃতিতে ধরে রাখেননি সাইদুর রহমান। নিজের জীবনেও জনকল্যাণের সেই ধারাকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তার প্রায় সমুদয় সম্পত্তি সমাজসেবামূলক কাজে ব্যয় করার উদ্দেশ্যে ‘জননেতা আতাউর রহমান ট্রাস্ট’ গঠন করে সম্পত্তি ট্রাস্টের নামে দলিল করে দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ট্রাস্টের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন তার ছোট বোন ও জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আরফিন কনকের মা খেলনা। সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন আতাউর রহমান স্মৃতি পরিষদের উপদেষ্টা মাসুদ রানা সরকার।
সাইদুর রহমানের এ উদ্যোগ তার ব্যক্তিজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে- সম্পদকে ব্যক্তিগত ভোগের পরিবর্তে মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের চিন্তা। সাংবাদিকতার পাশাপাশি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার এই মানসিকতাই তাকে সহকর্মী ও পরিচিতজনদের কাছে আলাদা করে তুলেছিল।
রাজশাহীর সাংবাদিক অঙ্গনে তার মৃত্যু তাই শুধু একজন প্রবীণ সহকর্মীকে হারানোর ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘ সাংবাদিকতা-অভিজ্ঞতা, ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং জনকল্যাণের একটি ধারারও বড় শূন্যতা তৈরি করল।
সহকর্মীদের অনেকের কাছেই তিনি ছিলেন অভিভাবকসুলভ। নবীন সাংবাদিকদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল আন্তরিক। সংবাদকর্মীদের নানা সংকটে পাশে দাঁড়ানো, পেশাগত বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া এবং সাংবাদিক সমাজের স্বার্থে ভূমিকা রাখার কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজশাহীর গণমাধ্যম অঙ্গনে পরিচিত মুখ ছিলেন।
তার মৃত্যুতে রাজশাহীর সাংবাদিক সমাজ হারাল তাদের একজন প্রবীণ অভিভাবককে। আর জনকল্যাণের যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি নিজের সম্পদ ট্রাস্টের মাধ্যমে মানুষের জন্য রেখে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন, সেটিই হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে বড় মানবিক উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে।
সাংবাদিকতা জীবনের ব্যস্ততা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং ব্যক্তিগত অর্জনের বাইরে মানুষের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার যে প্রত্যয় সাইদুর রহমান ধারণ করেছিলেন, তার প্রয়াণের পর সেই উত্তরাধিকারই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন রাজশাহীর সাংবাদিক সমাজসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

