২০ জানুয়ারী ২০২৬, মঙ্গলবার, ০৯:৪৮:৪১ অপরাহ্ন
বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার পথ মোটেও সহজ নয়
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০-০১-২০২৬
বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার পথ মোটেও সহজ নয়

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ঘিরে যে রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তা যতটা সরল মনে হয়েছিল, বাস্তবে ততটাই জটিল হয়ে উঠছে। জনমত জরিপে এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সামনে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ মোটেও মসৃণ নয়। কারণ, রাজনীতির মাঠে দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করছে জামায়াতে ইসলামী। একসময় মিত্র হলেও এখন দুই দলই আলাদা জোটে ক্ষমতার লড়াইয়ে নেমেছে।


তরুণ ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের বাড়তে থাকা প্রভাব, সংগঠিত তৃণমূল কাঠামো এবং আওয়ামী লীগ সমর্থক ও সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকের দোদুল্যমান অবস্থান—সব মিলিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বিএনপির জন্য যতটা সম্ভাবনার, ততটাই অনিশ্চয়তার বলে মনে করছেন ভারতীয় সাংবাদিক ও দ্য ডিপ্লোম্যাটের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সম্পাদক সুধা রামচন্দ্রন।


এ নিয়ে ‘বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাবনা বাড়াতে পারে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছেন তিনি। নিচে নিবন্ধটি তুলে ধরা হলো:


বাংলাদেশিরা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেবেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন; কারণ ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই প্রথম নির্বাচন। যদিও শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না, তবুও দলটির সমর্থকেরা বিজয়ী নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।


ভোটের আর এক মাসেরও কম সময় বাকি থাকতে জনমত জরিপগুলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর বিজয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। কিছু জরিপে দলটির ভূমিধস বিজয়ের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে—একটি জরিপে দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা বিএনপিকে ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, যেখানে জামায়াতে ইসলামী অনেক পিছিয়ে থেকে ১৯ শতাংশে রয়েছে। তবে অন্য কিছু জরিপে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে বেশ হাড্ডাহাড্ডি হিসেবে দেখানো হয়েছে, যেখানে বিএনপি মাত্র কয়েক শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে আছে।


আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনীতির মাঠ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। শুরুতে যেখানে বিএনপির নিরঙ্কুশ এগিয়ে থাকার ধারণা তৈরি হয়েছিল, সেখানে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই সমীকরণ জটিল হয়ে উঠছে। একদিকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের মাঠে না থাকা বিএনপিকে স্বস্তি দিচ্ছে, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর দ্রুত শক্তি সঞ্চয় ও সংগঠিত উত্থান বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের প্রভাব বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনগুলোতে তাদের সাফল্য এবং মাঠপর্যায়ে সক্রিয়তা বিএনপির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ফলে বিএনপি এখনও এগিয়ে থাকলেও, ক্ষমতায় যাওয়ার পথ যে মোটেও সহজ নয়— তা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।


এই নির্বাচনে মূল লড়াই হচ্ছে মধ্য-ডানপন্থি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এবং কট্টর ডানপন্থি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থি জোটের মধ্যে। একসময় বিএনপি ও জামায়াত একে-অপরের রাজনৈতিক মিত্র ছিল এবং একসঙ্গে নির্বাচন করত। এমনকি ২০০১-২০০৬ মেয়াদের বিএনপি সরকারে জামায়াতের নেতারা মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন।


মূলত শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের প্রতি অভিন্ন বৈরিতা দীর্ঘদিন বিএনপি ও জামায়াতকে একত্রে রেখেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হয়ে রাজনীতির মাঠ থেকে সরে যাওয়ার পর সেই বন্ধন আর নেই। গত এক বছরে সংবিধান সংস্কার ও নির্বাচন কবে হবে— এ ধরনের নানা ইস্যুতে দুই দলের মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। আর নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে এবং ক্ষমতার লড়াই যত তীব্র হচ্ছে, বিএনপি ও জামায়াতের বিচ্ছেদ ততই অনিবার্য হয়ে উঠেছে।


আসন্ন এই নির্বাচনে সংসদের ৩০০টি আসন নিয়ে লড়াই হবে। শুরু থেকে অবশ্য বিএনপিই এগিয়ে ছিল। কয়েক দশক ধরে দলটির সমর্থনভিত্তি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যেই ঘোরাফেরা করেছে। তবে সমস্যা ছিল সবসময়ই। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দমন-পীড়নে বিএনপি দুর্বল, হতাশ ও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। দলীয় চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তখন কারাগারে এবং অসুস্থ ছিলেন। তার ছেলে ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ছিলেন যুক্তরাজ্যে স্বেচ্ছা নির্বাসনে। এতে করে তিনি মাঠের নেতা-কর্মীদের থেকে দূরে ও বিচ্ছিন্ন বলে মনে হচ্ছিল।


ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগ পতনের পরের কয়েক মাসে বিএনপির কিছু নেতা-কর্মী নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তারা লুটপাট ও সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে দলটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকের কিছু ঘটনায় বিএনপি নতুন করে গতি পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তারেক রহমানের দেশে ফেরা নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা করেছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেয়ার পর কোনও বড় বিরোধ বা ভাঙন হয়নি; বরং এতে দল নতুন প্রাণ পেয়েছে।


বাংলাদেশে ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই তার মা খালেদা জিয়া মারা যান। তার মৃত্যু তারেক রহমান ও বিএনপির প্রতি সহানুভূতির ঢেউ তুলতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো আসন্ন নির্বাচনে দলটির জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার পথ মোটেও সহজ নয়, কারণ জামায়াতও ধীরে ধীরে শক্তি বাড়াচ্ছে।


১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামপন্থি সংগঠন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। তারা পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা করে এবং ‘ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধে’ জড়িত ছিল। এর খেসারত জামায়াতকে দীর্ঘদিন দিতে হয়েছে। যদিও দলটির শক্তিশালী ও সুসংগঠিত তৃণমূল নেটওয়ার্ক আছে এবং রাজপথের উল্লেখযোগ্য শক্তিও আছে, তবু অতীতে তারা বড় কোনও নির্বাচনী সাফল্য পায়নি।


তবে এবার পরিস্থিতি বদলাতে পারে। সাম্প্রতিক কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ভালো ফল করেছে। শহুরে তরুণদের মধ্যে তাদের সমর্থন বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিবর্তন ও সুশাসনের প্রত্যাশায় থাকা অনেক ভোটারের কাছে জামায়াত এখন আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠছে।


আওয়ামী লীগ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও দলটির কিছু নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কয়েক দশক ধরে আওয়ামী লীগের সমর্থনভিত্তিও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে ছিল। শেখ হাসিনার পতনের পর তা কিছুটা কমলেও এখনও এই ভোটব্যাংক বেশ বড়। এই ভোটাররা কীভাবে ভোট দেবেন, তা-ই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করতে পারে— বিশেষ করে লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হলে।


এছাড়া মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৮ থেকে ১০ শতাংশ হচ্ছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। অতীতে তারা আওয়ামী লীগকে ‘ভোট দিতেন’। কিন্তু এবার বিএনপি ও জামায়াত— দুই দলই এখন এই ভোটব্যাংকের দিকে তাকিয়ে আছে। হিন্দু ভোটাররা বলছেন, দুই দল থেকেই তারা ‘ভয়ভীতি ও চাপের’ মুখে পড়ছেন। এছাড়া নেতৃত্ব পর্যায়ে বিএনপি ও জামায়াত— দুই দলই আওয়ামী লীগ সমর্থকদের টানতে নিজেদের ভাবমূর্তি বদলানোর চেষ্টা করছে।


বাংলাদেশে ফেরার পর প্রথম জনসভায় তারেক রহমান একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের কথা বলেছিলেন, যেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদেরও জায়গা থাকবে। জামায়াতের নাম না নিয়ে তিনি ভোটারদের স্মরণ করিয়ে দেন, ‘১৯৭১ সালে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় তারা (জামায়াত) ‘লাখ লাখ মানুষ হত্যা করেছিল’।’ অন্যদিকে জামায়াত তাদের স্বাধীনতাবিরোধী, নারী-বিদ্বেষী ও রক্ষণশীল ভাবমূর্তি ঝেড়ে ফেলতে চাচ্ছে। গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে তারা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি)-কে তাদের জোটে টানে।


এলডিপির নেতা কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। জামায়াত আশা করছে, তার অন্তর্ভুক্তিতে ১৯৭১ সালে তাদের ভূমিকার কারণে তৈরি হওয়া নেতিবাচক ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও কাটবে। অন্যদিকে এনসিপি গড়ে উঠেছিল ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন থেকে এবং ধারণা করা হচ্ছিল, তারা তরুণ ও প্রগতিশীল ভোটারদের টানবে। কিন্তু দলের তুলনামূলক ধর্মনিরপেক্ষ অংশ ভেঙে যাওয়ায় সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে গেছে।


আওয়ামী লীগ সমর্থক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বিএনপি না জামায়াত— কাকে ভোট দেবেন, তা নির্ভর করবে তারা অতীত ভুলে যেতে রাজি কি না তার ওপর। জামায়াত এখন দাবি করছে, তারা সংখ্যালঘু বা নারী-বিরোধী নয়। কিন্তু তাদের প্রার্থী তালিকাই ভিন্ন কথা বলছে। তারা মাত্র একজন হিন্দু প্রার্থী দিয়েছে এবং কোনও নারী প্রার্থী দেয়নি।


বিএনপির ক্ষেত্রে তারেক রহমান এখন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মধ্যপন্থি রাজনীতির কথা বললেও তার উদ্যোগেই অতীতে বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। খালেদা জিয়া ও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া অন্য সিনিয়র বিএনপি নেতারা নাকি সেই জোট নিয়ে ‘অস্বস্তিতে’ ছিলেন। এছাড়া বিএনপি এবার মাত্র দুজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে।


আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা এটাও বিবেচনায় নেবেন যে ভবিষ্যতের জন্য বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে কে তুলনামূলক ভালো বিকল্প। বিএনপির ‘নতুন ভিশন’ তাদের কিছুটা এগিয়ে রাখছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে কয়েক দশকের বৈরিতা কি তারা ভুলতে পারবে?


দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ একে অপরের সরকার অচল করে দিয়েছে, রাজপথে ও নির্বাচনে মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়েছে। এখন সেই আওয়ামী লীগ সমর্থকেরাই বিএনপির জয়ের ভাগ্য বদলে দেয়ার অবস্থানে আছেন। ভোটের দিনে তারা কি বিএনপিকে জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবেন?


শেয়ার করুন