২০ জানুয়ারী ২০২৬, মঙ্গলবার, ০১:০৮:২১ অপরাহ্ন
গুঁড়া দুধে ৬৭ ভাগই ভেজাল
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০-০১-২০২৬
গুঁড়া দুধে ৬৭ ভাগই ভেজাল

শান্তিনগরের মুদি দোকানি জাহিদ হাসানের দোকানে সব পণ্য পাওয়া গেলেও তিনি নিজের তিন বছরের কন্যাশিশুর জন্য খাদ্যদ্রব্য কেনেন ‘একটু উন্নত’ ডিপার্টমেন্ট-স্টোর থেকে। তার বিশ্বাস, ভালো ব্র্যান্ডের খাদ্যপণ্য শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যকর। দাম একটু বেশি হলেও তিনি সেখান থেকেই সন্তানের জন্য গুঁড়া দুধ, চকলেট, চিপস ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য কেনেন। 


পরীবাগের বাসিন্দা সালেহা চৌধুরী জানান, বাচ্চারা চকলেট, চিপস প্রভৃতি পছন্দ করে।


একটু বেশি দাম হলে ব্র্যান্ডের পণ্য কিনে থাকেন তিনি। শুধু তারাই নন, প্রত্যেক বাবা-মা সন্তানের জন্য একটু নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাবার খোঁজেন। ভালো ব্র্যান্ডের খাদ্যপণ্যকে নিরাপদ মনে করেন তারা। কিন্তু ‘ভালো ব্র্যান্ডের’ খাবারেও এখন ক্ষতিকর উপাদান মিলছে।

যেসব পণ্য মানুষ চোখ বন্ধ করে বাচ্চাদের জন্য কিনছেন তাতেও ভেজাল উপকরণ পাওয়া যাচ্ছে। বাচ্চাদের প্রিয় গুঁড়া দুধ তৈরি হচ্ছে ভেজাল ‘হয়ে পাউডার’ দিয়ে (এক ধরনের সাদা পাউডার)। সেসবে ‘দুগ্ধ উপাদান’ খুবই সামান্য। সম্প্রতি ল্যাব টেস্টে গোয়ালিনী নামের গুঁড়া দুধে মাত্র ১৭ শতাংশ দুগ্ধ উপাদান পাওয়া গেছে।

বাকি অন্তত ৬৭ শতাংশ ভেজাল উপাদান।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সস্তার ‘হয়ে পাউডার’ মিশিয়ে চকচকে মোড়কে বাজারে বিক্রি হচ্ছে বাহারি মিল্ক পাউডার। আদালতে প্রমাণ হওয়ার পরও আইনের ফোকর গলে সামান্য শাস্তিতেই পার পেয়ে যাচ্ছে জড়িতরা। ক্রেতাদের বোঝার উপায় নেই যে, গুঁড়া দুধের নামে তারা বাচ্চাদের ‘হয়ে পাউডার’ খাওয়াচ্ছেন। এরকম অনেক মানহীন শিশুখাদ্য বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে।


ভেজাল খাদ্যের ব্যাপারে সরকারের তৎপরতা খুবই সামান্য।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব পণ্য সরকার নির্ধারিত মান নিশ্চিত না করেই বাজারজাত করা হচ্ছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর উদাসীনতায় আইন থাকলেও কার্যকরী হচ্ছে না। যারা এসব করে তারা সহজেই ফোকর গলে বেরিয়ে যাচ্ছে। প্রস্তুতকারক, আমদানিকারক, বিক্রেতা কাউকে উল্লেখযোগ্য শাস্তি দেওয়া যাচ্ছে না। যার ফলে ভেজাল খাদ্য তুলে দিতে হচ্ছে কোমলমতি শিশুদের মুখে। এমনকি আমদানি করা ‘উন্নত’ মানের পণ্যেও ভেজাল ধরা পড়ছে।


সম্প্রতি বেশ কিছু শিশুখাদ্যে ভেজাল প্রমাণিত হওয়ায় বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে মামলা হয়েছে। মামলার নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা করা হয়। বিদেশি পণ্যের আমদানিকারকদের শাস্তি দেওয়া হলেও প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণহীন। ভেজাল প্রমাণিত হওয়ার পরও পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ অনুসন্ধানের জন্য যে ধরনের লজিস্টিক সাপোর্ট ও জনবল দরকার, তা এ খাতে নেই। বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্যের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।


গুঁড়া দুধে দুগ্ধ উপাদান ১৭ শতাংশ


কয়েক মাস আগে ‘গোয়ালিনী ডেইলি ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার’ গুঁড়া দুধের নমুনা সংগ্রহ করেছিল ডিএসসিসির খাদ্য পরিদর্শকরা। গোয়ালিনীর পণ্য রাসায়নিক ও ভৌত দুই পরীক্ষাতেই উত্তীর্ণ হয়নি।


পরীক্ষার রিপোর্টে দেখা গেছে, তাতে দুগ্ধ উপাদান আছে মাত্র ১৭ দশমিক ০৮ শতাংশ। বাকি ৫৮.৯২ শতাংশ ভেজাল উপাদান। অন্যন্য উপাদানেও ভেজালের পরিমাণ ৮ দশমিক ৫২ শতাংশ। ৬৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভেজাল উপাদানে তৈরি হচ্ছে গোয়ালিনীর গুঁড়া দুধ।


গোয়ালিনী গুঁড়া দুধে দুগ্ধ চর্বির পরিমাণ থাকার কথা ছিল ৪২ শতাংশ বা তার কমবেশি। কিন্তু রাসায়নিক পরীক্ষায় এর পরিমাণ পাওয়া গেছে মাত্র ৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ ৩৪ দশমিক ৪২ শতাংশ ভেজাল উপাদান। দুগ্ধ প্রোটিন কমপক্ষে ৩৪ শতাংশ থাকার কথা থাকলেও পাওয়া গেছে মাত্র ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ। এখানে ভেজালের পরিমাণ ২৪ দশমিক ৫০ শতাংশ।


গুঁড়া দুধ বলে বিক্রি হওয়া পণ্যটিতে দুগ্ধ উপাদানের পরিমাণ থাকার কথা ছিল অন্তত ৭৬ শতাংশ। অম্লতা থাকার কথা ছিল অনূর্ধ্ব ১৮ শতাংশ, গোয়ালিনীতে পাওয়া গেছে ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ। লেডের নির্ধারিত মান শূন্য দশমিক ০২ থাকলেও এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ৫ শতাংশ আর্দ্রতার জায়গায় পাওয়া গেছে ৪ দশমিক ১১ শতাংশ।


প্যাকেটের গায়ে পুষ্টিগুণের তালিকা দেওয়া আছে। এসব পণ্য ল্যাবে পরীক্ষা করে তালিকার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি। এমনকি স্ট্যান্ডার্ড মানের সঙ্গেও উপাদানের অনেক ফারাক পেয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।


‘গোয়ালিনী ডেইলি ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার’ নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে তৈরির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় পণ্যগুলো বাজার থেকে প্রত্যাহার ও ৩ লাখ টাকা জরিমানা করে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত। গত ১০ ডিসেম্বর স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত সাহারা বীথি ওই আদেশ দেন। নিম্নমানের গুঁড়া দুধ সরবরাহের দায়ে এসএ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মো. সাহাবুদ্দিন আলমের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল একই আদালত। পরে আদালতে হাজির হয়ে দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন তিনি এবং তাদের ভেজাল পণ্য বাজার থেকে তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। গত ডিসেম্বর মাসে গোয়ালিনী গুঁড়া দুধের কিছু প্যাকেট ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানা গেছে।


মামলার বাদী এবং প্রসিকিউটিং অফিসার মোহা. কামরুল হাসান বলেন, ‘দোষ স্বীকার করায় আদালত পণ্য ধ্বংসের আদেশ দেয়।’


এসএ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মো. সাহাবুদ্দিন আলমের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিয়ে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। কোম্পানির অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিনি দেশের বাইরে গেছেন। তবে এ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি কর্মকর্তারা।


তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু গোয়ালিনীই নয়, আসলাম টি কোম্পানির ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার, একই কোম্পানির পূর্ণ ননিযুক্ত গুঁড়া দুধ, ডানো ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার, ড্যানিশ ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার, ইনস্ট্যান্ট ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার (নেসলে) ও স্টারশিপ গুঁড়া দুধ ল্যাব টেস্টে উত্তীর্ণ হয়নি। এসব গুঁড়া দুধের আমদানিকারকদের বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়েছে।


ভেজাল পণ্যের বিএসটিআই লোগো : বাজারজাত করা বেশ কয়েকটি গুঁড়া দুধের প্যাকেটে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) লোগো এবং কিউআর কোড দেখা গেছে। অন্যান্য পণ্যেও এই লোগো পেয়েছেন খাদ্য পরিদর্শকরা। তারা বলছেন, পণ্যের নমুনা নির্ধারিত মান পূর্ণ করলেই বিএসটিআই লোগো ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। ‘বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন আইন, ২০১৮’ অনুযায়ী গুঁড়া দুধ, চকলেট, বিস্কুট বা শিশুখাদ্যে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক।


বিএসটিআই-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আইনে বাধ্যবাধকতা থাকায় ভেজাল অনেক পণ্যের প্যাকেটের গায়ে নকল লোগো এবং কিউআর কোড দেওয়া থাকে।


বিএসটিআইয়ের সমন্বয় কর্মকর্তা মোহাম্মদ তৌহিদুর রহমান বলেন, ‘মানহীন অনেক পণ্যে বিএসটিআইয়ের নকল লোগো দেওয়ার অভিযোগ আছে। বিষয়টি মাথায় রেখে লোগোর সঙ্গে এখন কিউআর কোড দিয়ে দেওয়া হয়। গ্রাহকরা কিউআর কোড স্ক্যান করলে ওই পণ্য নিবন্ধিত কি না, নিশ্চিত হতে পারবেন।’ তিনি বলেন, ‘বিএসটিআই নিবন্ধিত কোনো পণ্যে ভেজাল প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অভিযোগ পেলে মোবাইল কোর্টও পরিচালনা করা হয়।’


শেয়ার করুন