নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি পিএলসি (নেসকো)-এর প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের প্রস্তাবকে ঘিরে রাজশাহীতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর আবেদনের প্রেক্ষিতে বিষয়টি যাচাই করতে একটি সম্ভাব্যতা যাচাই কমিটি গঠন করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। তবে রাজশাহীর বিভিন্ন মহল থেকে নেসকোর সদর দপ্তর বিভাগীয় শহর রাজশাহী থেকেই পরিচালনার দাবি জোরালোভাবে উত্থাপিত হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে দেওয়া আবেদনে বলা হয়েছে, নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি পিএলসি (নেসকো) বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে উত্তরবঙ্গের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের মোট ১৬টি জেলায় নেসকোর মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
নেসকোর অপারেশনাল এলাকা উত্তরের পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং পূর্ব-দক্ষিণে পাবনা জেলা পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় সদর দপ্তর রাজশাহীতে থাকায় রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলার কাজ যথাসময়ে সম্পন্ন করতে কিছুটা সমস্যা দেখা দিচ্ছে বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এ প্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় নেসকোর প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে একটি কমিটি গঠন করেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (সমন্বয় অনুবিভাগ) মোহাম্মদ সানাউল হককে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। এছাড়া কমিটিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), ঢাকা থেকে একজন উপযুক্ত প্রতিনিধিকে সদস্য হিসেবে মনোনয়নের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
গত ৩ মার্চ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ফারজানা খানমের স্বাক্ষরে জারি করা এক পরিপত্রে এ তথ্য জানানো হয়। পরিপত্রে বলা হয়েছে, গঠিত কমিটিকে এক মাসের মধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। প্রয়োজনে কমিটি অতিরিক্ত সদস্য কো-অপ্ট করতে পারবে।
এদিকে বিষয়টি সামনে আসার পর রাজশাহীর বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও নাগরিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, বিভাগীয় শহর রাজশাহী থেকে নেসকোর মতো একটি বড় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর অন্য জেলায় স্থানান্তর করা হলে এ অঞ্চলের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব কমে যেতে পারে।
রাজশাহীতে “সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)”–এর জেলা সভাপতি আহমেদ সফি উদ্দীন মনে করেন, নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো)-এর মতো একটি বড় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর রাজশাহী থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা এই অঞ্চলের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বিষয়টি নিয়ে সরকারকে আরও গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর রাজশাহী একটি বড় প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে রাজশাহী বিভাগ ভেঙে খুলনা ও পরে রংপুর বিভাগ সৃষ্টি হওয়ায় এ অঞ্চলের প্রশাসনিক গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমেছে। বর্তমানে রাজশাহী একটি বিভাগীয় শহর হলেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর অন্যত্র স্থানান্তরের কারণে এর গুরুত্ব আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আহমেদ সফি উদ্দীন বলেন, অতীতেও রাজশাহী থেকে কয়েকটি সরকারি বা আধা-সরকারি দপ্তর বগুড়াসহ অন্য জেলায় নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি ইতোমধ্যে স্থানান্তরও হয়েছে। ফলে নতুন করে নেসকোর মতো একটি বড় প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর সরানোর উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তার মতে, রাজশাহী প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত দিক থেকে উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রযুক্তিবিদ এবং পেশাজীবীদের বসবাস রয়েছে। নেসকোর মতো প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনায় এসব বিশেষজ্ঞ ও গবেষণার সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যা রাজশাহীতে সহজলভ্য।
তবে তিনি বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে এক এলাকার সঙ্গে অন্য এলাকার অযথা বিরোধ বা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করা ঠিক নয়। তার মতে, বগুড়াও দ্রুত উন্নয়নশীল একটি জেলা এবং সেখানে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গবেষণা কেন্দ্র, আইটি ভিলেজ, হাসপাতাল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নতুন উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে, যা সরাসরি জনকল্যাণে ভূমিকা রাখবে।
সুজনের এই নেতা আরও বলেন, নেসকোর সদর দপ্তর মূলত প্রশাসনিক কাজের কেন্দ্র। সাধারণ গ্রাহকদের অধিকাংশ সেবা জেলা পর্যায়ের আঞ্চলিক অফিসগুলো থেকেই দেওয়া হয়, যা ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলায় রয়েছে। তাই হঠাৎ করে সদর দপ্তর স্থানান্তরের মতো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে এর প্রয়োজনীয়তা ও প্রভাব গভীরভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের প্রস্তাবের পেছনে কারও ভুল পরামর্শ বা অযাচিত প্রভাব থাকতে পারে, যা সরকারের ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বিষয়টি নিয়ে সরকারকে সতর্ক ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আহমেদ সফি উদ্দীন বলেন, উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে নেসকোর সদর দপ্তর রাজশাহীতেই রাখা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

