৩১ জানুয়ারী ২০২৬, শনিবার, ১০:১৫:৩৫ পূর্বাহ্ন
তাঁবুতে মানবেতর জীবনযাপন করছে গাজাবাসী
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৬-০১-২০২৬
তাঁবুতে মানবেতর জীবনযাপন করছে গাজাবাসী

ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সেখানকার মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। দুই বছর ধরে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় উপত্যকার অধিকাংশ ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে অসংখ্য মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বাধ্য হয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তাবু টানিয়ে বসবাস করছেন তারা, যেখানে ন্যূনতম বাসযোগ্য পরিবেশ নেই। এতে শ্বাসকষ্ট ও পেটের পীড়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন গাজার বাসিন্দারা।


যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আবু আমর পরিবার ১৭ বারের বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। প্রতিবার স্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবন আরও সংকুচিত হয়েছে। বর্তমানে উপায়ন্তর না পেয়ে গাজার রিমাল এলাকায় একটি আবর্জনার ভাগাড়ের পাশে তাবু খাটিয়ে বসবাস করছে পরিবারটি। দূষণ, অসুস্থতা ও অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিদিন লড়াই করে টিকে থাকতে হচ্ছে তাদের।


৬৪ বছর বয়সী আবু আমর বলেন, ‘গাজায় আমরা দুটি যুদ্ধের মধ্যে বসবাস করছি—একটি বোমা হামলা, আরেকটি আবর্জনা। আমার অ্যাজমার সমস্যা আছে। এজন্য সব সময় ইনহেলার সঙ্গে রাখি। রাতে সেটি বালিশের নিচে রাখি। ময়লার দুর্গন্ধে শ্বাসনালি বন্ধ হয়ে গেলে কয়েকবার ব্যবহার করতে হয়।’


আবু আমরের পুত্রবধূ সুরাইয়া আবু আমর পাঁচ সন্তানের জননী। তিনি বলেন, তাবুতে ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। পানির তীব্র সংকট রয়েছে। এ কারণে মাসে কয়েকবার পেটের পীড়ায় ভুগতে হয়।


তিনি জানান, ইসরায়েলি হামলার আগে তাদের জীবন ছিল গুছানো ও পরিচ্ছন্ন। বাইত আল–লাহিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে গাজা নগরীতে আশ্রয় নিতে হয় তাদের। এমন দুঃস্বপ্নের মধ্যে বসবাস করতে হবে—তা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি।


ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। হামলায় গাজার অধিকাংশ ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও হামলা থামেনি। যুদ্ধবিরতির পর থেকে এ পর্যন্ত চার শতাধিক শিশু নিহত হয়েছে। অনেক ফিলিস্তিনির মতে, গাজাকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলতে এটি পরিকল্পিত চেষ্টা।


এমনই মনে করেন ৪০ বছর বয়সী সেলিম। তিনি বলেন, ‘বর্জ্যের পাশে থাকার কারণে আমরা চরম হতাশায় ভুগছি। আমার সন্তানেরা শীত ও গরমে খুব কষ্ট পাচ্ছে। দুর্গন্ধে খেতে বসলে খাবার পেটে যায় না, বমি আসে।’


ঝড়ের সময় নর্দমার পানি তাবুর ভেতরে ঢুকে পড়ে বলেও জানান তিনি। সেলিম বলেন, ‘ঝড়–বাতাস হলে নর্দমার পানি তাবুর ওপর চলে আসে। কখনো কাপড়েও ছিটে পড়ে। বাড়তি পরিষ্কার কাপড় নেই। বেইত লাহিয়া থেকে কাপড় ছাড়াই পালিয়ে এসেছি। কখনো কখনো নোংরা কাপড়েই নামাজ আদায় করতে হয়।’


এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভুগছে শিশুরা। ১৩ বছর বয়সী রাহাফ বলে, ‘পরিচ্ছন্নতার অভাবে আমার চুল পড়ছে, ত্বকেও সংক্রমণ হয়েছে।’


চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলেছেন, ময়লা–আবর্জনা, নর্দমার পানি ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে গাজায় রোগাক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।


আল-শিফা মেডিক্যাল কমপ্লেক্স-এর ফুসফুস বিভাগের প্রধান আহমেদ আলরাবিই বলেন, ‘গাজার জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি ভয়াবহ। আমরা ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ দেখতে পাচ্ছি। যুদ্ধের আগে এমন জটিলতা কখনো দেখিনি বা মোকাবিলা করিনি।’


গাজার মিউনিসিপ্যাল কর্মকর্তারা জানান, ইসরায়েলি হামলায় পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামো প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। গাজা মিউনিসিপ্যালিটির জনসংযোগ বিভাগের প্রধান আহমেদ দিরিয়েমলি বলেন, গাজা নগরীর ভেতরে দেড় লাখ মিটারের বেশি পাইপ এবং প্রায় ৮৫ শতাংশ পানির কূপ ধ্বংস হয়েছে। পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টও পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।


এদিকে গাজার পূর্বাঞ্চলে বর্জ্য ফেলার স্থানে প্রবেশে বাধা দিচ্ছে ইসরায়েল। ফলে শহরজুড়ে বর্জ্যের স্তূপ জমে গেছে। গাজা মিউনিসিপ্যালিটির মুখপাত্র হুসনি মুহানা বলেন, উপত্যকায় ৭ লাখ টনের বেশি বর্জ্য জমেছে। এর মধ্যে শুধু গাজা নগরীতেই জমেছে সাড়ে তিন লাখ টনের বেশি।


শেয়ার করুন