১২ জুলাই ২০২৬, রবিবার, ০৩:২২:১২ পূর্বাহ্ন
ত্রিবেদীর ঢাকা মিশন: প্রত্যাশা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
  • আপডেট করা হয়েছে : ১১-০৭-২০২৬
ত্রিবেদীর ঢাকা মিশন: প্রত্যাশা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

বাংলাদেশের জঙ্গিবাদ ভয়াবহ রূপে আত্মপ্রকাশের দশম বছর ছিলো গতকাল। ‌আলোচিত সেই হলি আর্টিজেন বেকারির কল্পনাতীত ভয়ংকর দিনটিতে নিহতদের স্মরণে ঢাকায় নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত তার বাসভবনে একটি আয়োজন করেন। সেখানে জড়ো হন প্রায় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতেরা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অ্যাম্বাসেডর, ভারতীয় হাই কমিশনার, জাপানের রাষ্ট্রদূত, ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত, যুক্তরাষ্ট্রে দূতাবাসের কনসুলার জেনারেলসহ অন্যান্য কূটনীতিটা। 


যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে হলি আর্টিজেনে নিহতদের স্মরণের পর ইতালির রাষ্ট্রদূতের মধ্যাহ্ন ভোজের আয়োজনে অংশগ্রহণ করেন কূটনীতিক, ভিকটিম পরিবারের সদস্য ও বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের কূটনৈতিক প্রতিবেদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সাংবাদিকরা। 


সেই অনুষ্ঠানে নবনিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে চমৎকার এবং অর্থবহ আলোচনা হয়। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতা হয় প্রায় এক ঘণ্টা। উঠে আসে নতুন দায়িত্ব নেয়ার অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ, প্রতিবন্ধকতা, সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার যথাযথ প্রক্রিয়া এবং মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ার বিষয়গুলো। 


বাংলাদেশ ওই মানব সম্পর্কে তার মনোভাব 

মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কে বিশ্বাস করেন দিনেশ ত্রিবেদী। ভারতের রাজনীতিতে তার সুনাম আছে। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে এবার তার মিশন বাংলাদেশ। কূটনীতিতে এটি তার অভিষেক। বাংলাদেশের পর অন্য কোনো দেশে যাবেন কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়নি। তবে খুব আগ্রহী হয়ে জানতে চেয়েছিলাম মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তার মনোভাবের কথা। 


এ বিষয়ে তার কথার সারসংক্ষেপ অনেকটাই এরকম। প্রথমত, বাংলাদেশ এবং ভারত দুটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র, দেশ। আর দেশ দুটির ভৌগোলিক অবস্থান এবং ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে দু'দেশের মানুষের সম্মিলিত সংগ্রামের কথা তিনি তুলে ধরেছিলেন। ব্রিটিশ কলোনি থেকে মুক্তি থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ বা তার পরবর্তী নানা সময়ে উভয় দেশের মধ্যকার উষ্ণ সম্পর্কের চমৎকার সময়গুলো বর্ণনা করেন তিনি। ঐতিহাসিক এই বন্ধনের বিষয়গুলো বলতে গিয়ে তার কথাবার্তায় রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এবং এর জনগণের প্রতি সম্মান দেখেছি। আমাদের সঙ্গে কথা বলার সময় মনে হচ্ছিল, 'তিনি তার খুব কাছের কিছু মানুষ এর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন। বন্ধুর মতো করে কথা বলছেন। সম্পর্ক উন্নয়নে আমাদের পরামর্শ চাচ্ছেন সবমিলিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে তার আন্তরিকতার কোনো প্রকার ঘাটতি মনে হয়নি। ‌ 


আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে চলতে চান। 

বাংলাদেশে মন্ত্রী পদমর্যাদায় পোস্টিং পাওয়া এই রাষ্ট্রদূত খুব দৃঢ়ভাবে একটি বার্তা দিয়েছেন আমাদের। সেটা হলো, তিনি কথিত প্রটোকলের বেড়াজাল সবসময় মানবেন না। মানুষের সঙ্গে মিশতে কূটনৈতিক ভাষা ব্যবহার করবেন না। উনার ভাষায়, 'দেখো, আমি ওসব নিয়মকানুন মেনে চলতে চাই না। ওরা আমাকে বিভিন্নভাবে আটকে রাখতে চায়। আমি সেটা করতে দিচ্ছি না। আমি রাজনীতি করে এসেছি। মানুষের সঙ্গে থাকার একটা অভ্যাস রয়ে গেছে। সুতরাং ওরা চাইলেই আমাকে আটকে রাখতে পারবে না। আমি তোমাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সম্পর্ক বজায় রাখবো।'। 


ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে এটি আনুষ্ঠানিক কোনো সাক্ষাৎকার ছিল না। সুতরাং রেকর্ড করা কিংবা রেকর্ড করার অনুমতি চাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। হুবহু তার বক্তব্য লেখা আমার পক্ষে সম্ভব না। মধ্যাহ্নভোজের ফাঁকে ব্যক্তিগত আলাপচারিতা ছাড়া এই কথাবার্তার অফিশিয়াল কোনো মানে দাঁড় করানো যাবে না। তবে এটা সত্য যে, অফ দা রেকর্ডে তার মনোভাব অন্তত সুস্পষ্ট হয়েছে। 


'পিপল টু পিপল কানেকশন'

সদ্য বিদায় ভারতীয় সাবেক হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের ভিসা পুনরায় শিথিল করতে ব্যর্থ হয়েছেন। হয়ত আমলাতান্ত্রিক কোনো জটিলতা ছিলো। তবে ভারত সরকারের কাছে মন্ত্রী পদমর্যাদার এই রাষ্ট্রদূত দায়িত্ব নেয়ার প্রথম দিন তথা রাষ্ট্রপতির কাছে নিজের পরিচয় পত্র পেশ করার পরপরই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে সুস্পষ্ট করে জানিয়েছেন, জুনের ২৮ তারিখ থেকে সব প্রকার ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালু হচ্ছে। এ প্রসঙ্গটি তিনি আমাদের সঙ্গে আবারও তুলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, 'আমি এখানে এসে যেটা প্রথমে করতে চেয়েছি সেটা হলো মানুষের সমস্যার বিষয়গুলো দূর করা। অনেকেই চিকিৎসা বা কেনাকাটার উদ্দেশ্যে ভারত যায়। তাদেরকে আটকে রাখার কোনো মানে হয় না। যত দ্রুত সম্ভব সেই সমস্যা সমাধানের চিন্তা ছিল আমার। তাই প্রথম যে কাজটি আমি করেছি, তা হলো ভিসা কার্যক্রম চালু করে মানুষের ভোগান্তি কমানো। যাতে করে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা থমকে না থাকে।' 


তার বক্তব্যের এই অংশটা আমার ভালো লেগেছে। দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন থাকতেই পারে এবং থাকবেই। রাষ্ট্র দুটি যখন প্রতিবেশী, তখন কখনো উষ্ণতা বাড়বে, কখনো হিম শীতল অধ্যায় পার করতে হবে। এটা স্বাভাবিক এবং হাওয়ারই কথা। কিন্তু এগুলো রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক বিষয়। এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের খুব বেশি সংশ্লিষ্টতা নেই। সুতরাং ভিসা কার্যক্রম পুনরায় পরিপূর্ণরূপে সচল করার জন্য তাকে সাধুবাদ দেওয়া যায়। ‌


ভিসা প্রসঙ্গে আমাদের পক্ষ থেকে তাকে একটি তথ্য দেওয়া হয়। বাংলাদেশের একটি দালাল চক্র দূতাবাসের আরেকটি অসাধু অংশের সঙ্গে মিলেমিশে ভিসার শিডিউল বাণিজ্য করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কয়েকটি ভিডিয়োতে দেখা গেছে, এক থেকে দেড় লাখ টাকা দিয়েও কেউ কেউ শিডিউল নিচ্ছেন। 


এ বিষয়টি তার সামনে তুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গেই তার সহকর্মীকে বিষয়টি নোট করতে বললেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে পদক্ষেপের আশ্বাস দিলেন তিনি। 


'আমি নয় পা এগোবো'

কথা বলার সময় রাজনীতিকরা প্রতিশ্রুতি দিতে ভালোবাসেন। দিনেশ ত্রিবেদী এখনো সেই চরিত্রেই আছেন। আমাদের এক সহকর্মী জানতে চাইলেন, 'পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে রেল যোগাযোগ চালুর বিষয়ে ভারতের অবস্থান কী? তার সোজা সাপটা উত্তর, 'বাংলাদেশ সরকার একপা এগোলে আমি নয় পা এগোবো।' এটিও প্রতিশ্রুতি। তবে রাজনৈতিক নয়, বাংলাদেশের সঙ্গে চমৎকার সম্পর্ক গড়ার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। 


শেয়ার করুন