২৫ জুলাই ২০২৬, শনিবার, ০১:৫১:০৫ পূর্বাহ্ন
ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী বাঘা শাহী মসজিদ
রাকিবুল হোসেন শাহীন, চিফ রিপোর্টার:
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৪-০৭-২০২৬
ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী বাঘা শাহী মসজিদ

৫০১ বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে রাজশাহীর বাঘা শাহী মসজিদ। ১৫২৩-১৫২৪ সালে নির্মিত এই প্রাচীন স্থাপনাটি বাংলাদেশের ৫০ টাকার নোট ও ১০ টাকার স্মারক ডাকটিকিটে স্থান পেয়েছে। পুরো মসজিদজুড়ে রয়েছে অপরূপ টেরাকোটার কারুকাজ। ১০ গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটিতে রয়েছে ৫টি দরজা। মাঝখানের প্রধান দরজার ওপরে ফারসি হরফে একটি শিলালিপি খোদাই করা আছে। মসজিদটির চার কোণায় রয়েছে চারটি চৌচালা গম্বুজ। ভেতরে আছে ৬টি স্তম্ভ এবং ৪টি অপূর্ব কারুকার্যখচিত মিহরাব। মিহরাবের গায়ে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী আম, গোলাপ ফুলসহ নানা নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৭৫ ফুট, প্রস্থ ৪২ ফুট, উচ্চতা ২৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। দেয়ালের পুরুত্ব ৮ ফুট। প্রতিটি গম্বুজের ব্যাস ২৪ ফুট ও উচ্চতা ১২ ফুট। ২০০৭ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মসজিদের ক্ষতিগ্রস্ত টেরাকোটা নকশা প্রতিস্থাপন করে। কাজটি করেছিলেন সিরাজগঞ্জের টেরাকোটা শিল্পী মদন পাল। মসজিদটি সমতল থেকে ৮-১০ ফুট উঁচু বেদির ওপর অবস্থিত। আঙিনা ঘিরে সীমানাপ্রাচীর রয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণে দুটি প্রবেশপথ ও ফটক আছে। দক্ষিণের ফটকটি অক্ষত থাকলেও উত্তরেরটির অবস্থা জরাজীর্ণ। ১৫২৩-২৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলার স্বাধীন সুলতান নুসরত শাহ মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের সামনেই রয়েছে প্রায় ২৫৬ বিঘা জমির ওপর সুবিশাল দিঘি। এছাড়া মসজিদ প্রাঙ্গণ ও আশপাশে রয়েছে অসংখ্য আউলিয়ার মাজার ও একটি জাদুঘর। উত্তর পাশে রয়েছে হজরত শাহ দৌলা (র.) ও তার পাঁচ সঙ্গীর মাজার। দক্ষিণ-পশ্চিমে রয়েছে তার পরিবারের সদস্যদের মাজার। বাইরে দক্ষিণ-পশ্চিমে দুজন বাগদানি দরবেশসহ জহর খাকী পীরের মাজারও আছে। পাশেই রয়েছে একটি নারী মসজিদ। স্থাপত্যশৈলীর আকর্ষণে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের পর্যটকরা ছুটে আসেন এখানে। বিশেষ করে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসে ভিড় সবচেয়ে বেশি থাকে বলে জানিয়েছেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী আঞ্চলিক জাদুঘরের মডেলার মো. এনায়েত হোসেন। বাঘা শাহী মসজিদ দেখতে আসা দর্শনার্থী সেকাদুল ইসলাম বলেন, ৫০ টাকার নোট ও ১০ টাকার ডাকটিকিটে এই মসজিদের ছবি আছে। না দেখলে বোঝা যাবে না এটি কত সুন্দর। এ যুগের স্থাপনায় এমন টেরাকোটার কাজ কল্পনাও করা যায় না। অনেকের বিশ্বাসও জড়িয়ে আছে এই মসজিদকে ঘিরে। সালমা খাতুন মেয়ের রোগমুক্তির মানত করে মসজিদে মুরগি দিয়েছেন। তার মতো অনেকেই মানত করেন। পূর্বদিকের পুকুর পাড়ে অনেকেই রান্না করে মানুষকে খাওয়ান। 


মসজিদের মুয়াজ্জিন শাফিকুল ইসলাম জানান, প্রতিদিনই দূরদূরান্ত থেকে আমাদের বাঘা শাহী মসজিদে অনেক মানুষ আসে প্রতি ঈদের সময়টায় প্রচুর দর্শনার্থী আসেন। এবং জুমার দিনে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মুসল্লিরা আসে নামাজ পড়ে।


প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী, বিভাগ ও বগুড়ার আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান বলেন, ১৫২৩-২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মসজিদটির বর্তমান বয়স ৫০১ বছর। প্রতি বছরই প্রচুর দর্শনার্থী আসেন।


বাঘা শাহী মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও বাঘা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শাম্মী আক্তার বলেন, ঐতিহাসিক বাঘা শাহী মসজিদ আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের একটি অনন্য নিদর্শন। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য পর্যটক ও দর্শনার্থী এই মসজিদ দর্শনে আসেন।

পর্যটকদের সুবিধার্থে মসজিদ কমিটি ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা ইতোমধ্যে মসজিদ চত্বরের পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা এবং ওজু ও নামাজের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছি। দর্শনার্থীদের জন্য তথ্য বোর্ডও স্থাপন করা হয়েছে।


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল আলম বলেন, এটি প্রাচীনতম একটি মসজিদ। প্রায় ৫০০ বছরের বেশি বয়সের এই স্থাপনা বাংলাদেশের গর্ব।


দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বাঘা আসা যায়। রাজশাহী শহর থেকে বাসস্ট্যান্ড থেকে বাঘা উপজেলা সদরের বাস। নাটোর বা পুঠিয়া হয়ে বানেশ্বর বাজার-চারঘাট-বাঘা সড়ক।  

ট্রেনে আড়ানী স্টেশনে নেমে ভ্যান, সিএনজি বা অটোতে বাঘা সদর। মসজিদটি একদম কাছেই।  

দর্শনার্থীদের যানবাহন রাখার ব্যবস্থা মসজিদের দক্ষিণ পাশে রয়েছে।

শেয়ার করুন