০৪ অগাস্ট ২০২৬, মঙ্গলবার, ১১:১১:৪৬ অপরাহ্ন
শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারে দেখা দিচ্ছে ‘ভার্চুয়াল অটিজম’
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৪-০৮-২০২৬
শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারে দেখা দিচ্ছে ‘ভার্চুয়াল অটিজম’

ডিজিটাল যুগে স্ক্রিন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, টেলিভিশন ও কম্পিউটার এখন শুধু বিনোদন নয়, শিক্ষা ও যোগাযোগেরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এসব ডিভাইসের ব্যবহার দ্রুত বেড়ে চলেছে। তবে প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতার পাশাপাশি বাড়ছে একটি গুরুতর উদ্বেগ-অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের উপর এর নেতিবাচক প্রভাব।



বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু (ডব্লিউএইচও) এবং বিভিন্ন শিশুস্বাস্থ্য সংস্থা এরই মধ্যে সতর্ক করেছে যে, কম বয়সী শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার তাদের সামগ্রিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ‘ভার্চুয়াল অটিজম’ শব্দটি অনেক আলোচনায় এসেছে। অনেক অভিভাবকই এখন প্রশ্ন করছেন এটি কি সত্যিই কোনো চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বীকৃত রোগ? আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, এটি কি আসলেই অটিজমের একটি রূপ?


বাস্তবতা হলো, বিষয়টি যতটা সহজে উপস্থাপন করা হচ্ছে বা প্রচার করা হচ্ছে, তাসলে বাস্তবে এটি বেশ জটিল। প্রথমেই বলে রাখি ‘ভার্চুয়াল অটিজম’ চিকিৎসা বিজ্ঞানের স্বীকৃত কোনো রোগ বা টার্ম নয়। এমনকি এটি ডিএসএম-৫-টিআর বা আইসিডি-১১-এর মতো আন্তর্জাতিক রোগ নির্ণয় নির্দেশিকায় অন্তর্ভুক্তও নয়। এসলে বিশেষজ্ঞরা এই শব্দটি ব্যবহার করেন এমন শিশুদের বোঝাতে, যারা দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সংস্পর্শে থাকার কারণে কিছু অটিজম-সদৃশ আচরণ প্রদর্শন করে।


যেমন ধরুন, এই শিশুদের মধ্যে দেখা যেতে পারে বাক বিকাশে দেরি, চোখে চোখ রেখে যোগাযোগের অভাব, ডাকে সাড়া কম দেওয়া, সামাজিক মেলামেশায় অনাগ্রহ, একই আচরণ বারবার করা এবং বাস্তব মানুষের চেয়ে স্ক্রিনের প্রতি বেশি আকর্ষণ। এসব লক্ষণ অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারের সঙ্গে মিল থাকায় অনেক সময় অভিভাবকরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণা স্ক্রিন টাইমকে অটিজমের কারণ হিসেবে স্বীকৃত দেয়নি।


অটিজম একটি জটিল স্নায়বিক বিকাশজনিত অবস্থা, যা মূলত জেনেটিক ও জৈবিক কারণ দ্বারা নির্ধারিত। শুধু অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে কোনো শিশুর অটিজম তৈরি হয় এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে এর মানে এই নয় যে স্ক্রিন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিরাপদ।


অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনেক অভিজ্ঞতাকে সীমিত করে দেয়। ছোট শিশুরা ভাষা, আবেগ, সামাজিক আচরণ ও যোগাযোগ দক্ষতা শেখে মূলত সরাসরি মানুষের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে। কিন্তু যখন এই সময়ের বড় একটি অংশ স্ক্রিনে ব্যয় হয়, তখন তারা সেই শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।


ফলে কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের মধ্যে বাক বিকাশে দেরি, মনোযোগের ঘাটতি, আবেগ বোঝার দুর্বলতা এবং সামাজিক যোগাযোগে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব সমস্যা অনেক সময় অটিজমের মতো মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এগুলো পরিবেশগত প্রভাবজনিত বিকাশগত বিলম্ব।


এই কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞ ‘ভার্চুয়াল অটিজম’ শব্দটির ব্যবহারকে বিভ্রান্তিকর বলে মনে করেন। এটি এমন একটি ধারণা তৈরি করে, যেন শিশুটি অটিজমে আক্রান্ত, যদিও বাস্তবে তার সমস্যাগুলো পরিবর্তনযোগ্য এবং সঠিক হস্তক্ষেপে উন্নতি সম্ভব। তাই ‘অটিজম-সদৃশ আচরণ’ বা ‘স্ক্রিন-সম্পর্কিত বিকাশগত বিলম্ব’ শব্দগুলো ব্যবহার করাই বেশি বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য।


এটি বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অটিজম নির্ণয়ের জন্য প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রয়োজন। শুধু কিছু আচরণ দেখে বা স্ক্রিন ব্যবহারের ইতিহাস জেনে অটিজম নির্ণয় করা সঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে শ্রবণ সমস্যা, ভাষাগত বিলম্ব বা পরিবেশগত কারণও একই ধরনের লক্ষণ তৈরি করতে পারে।


অভিভাবকদের জন্য এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রযুক্তি নিজে সমস্যা নয়, বরং এর অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারই আসল ঝুঁকি। অভিভাবকের উপস্থিতিতে সীমিত সময় শিক্ষামূলক কনটেন্ট দেখা এবং শিশুকে একা দীর্ঘ সময় মোবাইল বা ট্যাবলেট দিয়ে রাখা এই দুই পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য বিশাল। প্রথমটি সহায়ক হতে পারে, কিন্তু দ্বিতীয়টি শিশুর বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।


শিশুর সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে হলে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার বিকল্প নেই। খেলাধুলা, গল্প বলা, বই পড়া, ছবি আঁকা, বাইরে সময় কাটানো এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত কথোপকথন এসবই শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা সাধারণত পরামর্শ দেন দুই বছরের নিচে শিশুদের ক্ষেত্রে স্ক্রিন এড়ানো উচিত, এবং বড় শিশুদের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ব্যবহার সীমাবদ্ধ রাখা জরুরি।


‘ভার্চুয়াল অটিজম’ শব্দটি বিশেষভাবে রোমানিয়ার শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মারিয়াস জামফির-এর মাধ্যমে আলোচনায় আসে, যিনি অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে কিছু শিশুদের মধ্যে অটিজম-সদৃশ আচরণ লক্ষ্য করেছিলেন।


শেয়ার করুন