১৯ অগাস্ট ২০২৬, বুধবার, ০৫:৫৩:০৮ অপরাহ্ন
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণের বড় অংশ হারিয়েছে ইরান
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৯-০৮-২০২৬
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণের বড় অংশ হারিয়েছে ইরান

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। গত কয়েক মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় পক্ষই কৌশলগত এই জলপথে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করেছে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক বিভ্রান্তি।



তবে বর্তমানে পাওয়া তথ্য বলছে, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর উপস্থিতি জোরদার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রণে ইরানের প্রভাব কমছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করা জাহাজের ৮০ শতাংশের বেশি ওমানের উপকূলঘেঁষা একটি আন্তর্জাতিকভাবে অনুমোদিত নৌপথ ব্যবহার করেছে। এই নৌপথের ব্যবহার ইরান দীর্ঘদিন ধরে বিরোধিতা করে আসছে।


ইরান প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি করে আসছে এবং ওমানের উত্তর উপকূলঘেঁষা ওই পথে চলাচলের চেষ্টা করা বেশ কয়েকটি জাহাজে হামলাও চালিয়েছে। এরপরও সম্প্রতি বেশির ভাগ জাহাজ ইরানের সতর্কতা উপেক্ষা করে মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তার আশ্বাসে ওই পথে চলাচল করছে।


কেপলারের অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান হোমায়ুন ফালাকশাহী বলেন, পরিস্থিতি দেখে ক্রমেই মনে হচ্ছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ অন্তত আংশিকভাবে হারিয়েছে ইরান।


বদলে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রণের চিত্র

এক মাস আগেও কেপলার হরমুজ প্রণালির ওমান-সংলগ্ন নৌপথে প্রায় কোনো জাহাজ চলাচল করতে দেখেনি। বর্তমানে ওই পথে জাহাজ চলাচল দ্রুত বেড়েছে। অন্যদিকে ইরানের পছন্দের নৌপথে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে শুল্ক আদায়ের সুযোগও হারিয়েছে দেশটি।


যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ এ সপ্তাহে শেষ হওয়ায় তাত্ত্বিকভাবে আবারও শুল্ক আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে ইরানের জন্য। তবে বাস্তবে দেশটি তা করতে পারছে বলে মনে হচ্ছে না।


পিকারিং এনার্জি পার্টনার্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ড্যান পিকারিং বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ পক্ষই ইরানের শুল্ক আদায়ের দাবি মেনে নিতে চায় না। এ কারণে ওমানের নৌপথই এখন সবচেয়ে যৌক্তিক বিকল্প হয়ে উঠেছে।


কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পারস্য উপসাগর থেকে তেল পরিবহনের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলবাহী জাহাজগুলোর একটি শ্রেণি ভিএলসিসি ভাড়া করেছে। লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডি লিপোর তথ্য অনুযায়ী, এসব জাহাজ বিপজ্জনক এলাকা পার হয়ে উপসাগরীয় ওমানের বাইরে গিয়ে ক্রেতাদের জাহাজে তেল স্থানান্তর করছে।


ইরানের হামলা এড়াতে এসব জাহাজের অনেকেই কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত নিজেদের শনাক্তকারী সংকেত বন্ধ রাখছে। ফলে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কিছু জাহাজ শনাক্ত করা গেলেও প্রচলিত পদ্ধতিতে তাদের গতিবিধি অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।


তবে হরমুজ প্রণালিতে বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি থাকা যুক্তরাষ্ট্র সব জাহাজের ওপর নজর রাখছে বলে দাবি করছে। দেশটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রণালি দিয়ে সরাসরি এবং বিকল্প পথে পুনর্নির্দেশিত মিলিয়ে গত সপ্তাহে প্রতিদিন প্রায় দেড় কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হতো।


পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেই যুক্তরাষ্ট্রও

এই তথ্যের ভিত্তিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার দাবি করেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সংঘাতের শুরু থেকেই তিনি এমন দাবি করে আসছেন।


তবে ইরানের অব্যাহত হামলা এবং যুদ্ধের আগের তুলনায় তেল পরিবহনের পরিমাণ কম থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবিও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। একইভাবে ইরানও যে আগের মতো প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারছে না, তার প্রমাণও মিলছে।


ড্যান পিকারিং বলেন, নিয়ন্ত্রণে থাকার অর্থ যদি পুরোপুরি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়, তাহলে ইরানও শুরু থেকেই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে ছিল না। তাঁর মতে, ইরানের মূল লক্ষ্য সম্ভবত নিয়ন্ত্রণের চেয়ে প্রতিরোধমূলক সক্ষমতা প্রদর্শন করা।


তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী যদি বিপুল পরিমাণ তেল নিরাপদে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়ে থাকে, তাহলে এক-দুই মাস আগের তুলনায় প্রণালিতে ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ—দুটিই উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।


এরই মধ্যে ওমান ও ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার নিয়ে আলোচনা করছে। বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের অসন্তোষের কারণ হয়েছে। তবে এই আলোচনা ভবিষ্যতে তেল পরিবহন ও প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।


শেয়ার করুন