১৯ অগাস্ট ২০২২, শুক্রবার, ১১:১৯:১৬ পূর্বাহ্ন
গুরুতর অপরাধেও সাজা ‘তিরস্কার’
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৮-০৫-২০২২
গুরুতর অপরাধেও সাজা ‘তিরস্কার’

চাকরি করেন পুলিশে। ১৬ বছরের কর্মজীবনে শৃঙ্খলাপরিপন্থি কাজ করেছেন অসংখ্যবার। যার বেশির ভাগ গুরুতর অপরাধ। অথচ অজ্ঞাত জাদুর কাঠির বলে প্রতিবারই গুরুদণ্ড তাকে স্পর্শ করতে পারেনি।

সর্বনিম্ন সাজা হয়েছে ‘তিরস্কার’। তবে তা একবার-দুবার নয়-১৩ বার। যেসব অপরাধে তার চাকরিই থাকার কথা নয়, সেখানে তাকে ইনস্পেকটর পদে পদোন্নতিও দেওয়া হয়েছে। হবিগঞ্জে ডিবির এসআই পদে থাকাবস্থায় ২০১২ সালে ‘সিম ডট কম’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির তথ্য দিয়ে কানাডায় যেতে স্টুডেন্ট ভিসাও চেয়েছিলেন।

এসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে সনদও জাল করেছেন। এসব জাল সনদ শিক্ষাগত যোগ্যতায় অন্তর্ভুক্ত করে নিজেকে মেধাবী হিসাবে জাহির করতেন। এভাবে নিজেকে উচ্চশিক্ষিত সাজানোর পাশাপাশি একাধিক বিয়েও গোপন করেছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী জন্মসনদ ব্যবহার করেন দুটি। ভয়ংকর এই পুলিশ কর্মকর্তার নাম মানিকুল ইসলাম মানিক। বিপি নং ৭৮০৪০৯৯১৩৭।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, মানিকুল ইসলাম মানিকের একে একে বিচিত্র প্রতারণায় নারীর সম্ভ্রমহানির এমন তালিকা এখন অনেক দীর্ঘ। যেখানে চাকরি করেছেন, সেখানেই তার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অগণিত নারী। এ ধারাবাহিকতায় সিলেটের প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য প্রবাসী পাত্রীও সর্বস্ব হারিয়েছেন।

একাধিক বিয়ে গোপন করে তাকে বিয়ে করেন এই মানিক। আবার পুলিশ সদর দপ্তরে সংরক্ষিত ব্যক্তিগত তথ্যবিবরণীতে তাকেই স্ত্রী হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করে রেখেছেন। প্রতারণার শিকার প্রবাসী ভিকটিমের বিস্তর অভিযোগের সত্যতা পেয়ে মানিককে সাময়িক বরখাস্ত করে বরিশাল পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়।

মানিকের পাশবিক নির্যাতনের স্বীকার কয়েক তরুণীর বোবা কান্না পুলিশের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে আঘাত করেছে। এছাড়া মাদক ও চোরাই গাড়ির ব্যবসা ছিল তার অবৈধ আয়ের উৎস। চোরাই সিন্ডিকেটের সঙ্গে সহযোহিগতায় থাকলেও বরাবরই নিজেকে আড়াল করার সুযোগ পেয়েছেন। যুগান্তরের দীর্ঘ অনুসন্ধানে সর্বনাশা এই মানিকের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রবাসী ভিকটিমের বড় ভাই আব্দুল হাকিম যুগান্তরকে জানিয়েছেন, ইনস্পেকটর মানিকের প্রতারণা সহ্য করতে পারেননি তার বোন। পুলিশ সদস্য হয়ে এভাবে একজন মানুষ প্রতারণা করতে পারে, তা কল্পনাও করতে পারেননি।

কয়েকটি বিয়ে গোপন এবং অগণিত নারীর সঙ্গে প্রতারণার বিষয়টি জানতে পেরে তার বোন মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। বিদেশের মাটিতে তার স্বাভাবিক চলাফেরা, আচার-আচরণে অনেক পরিবর্তন লক্ষ করছি। তীব্র মানসিক কষ্ট থেকে নিজেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ প্রধানসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন তিনি।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, মানিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, তা তদন্তে কয়েকটি টিম কাজ করছে। তবে কানাডায় যেতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে জাল সনদ তৈরির বিষয়টি অধিক গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া নারী নির্যাতনের বিষয়ে যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, তদন্ত শেষ করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে সিঙ্গাপুরে কানাডিয়ান ভিসা সেন্টারে ইমিগ্রেশন পুলিশের গোপন নজরদারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতার জাল সনদ জমা দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। এরপর থেকে সিঙ্গাপুরে কানাডিয়ান ভিসা সেন্টারে মানিকুল ইসলামকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়।

২০১৫ সালে পরিবারের ১১ সদস্যসহ কানাডায় যেতে আবেদন করেন মানিকুল ইসলাম। এর আগে আরও দুবার ভিসা চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হন তিনি। ওই আবেদনে উপস্থাপিত সার্বিক তথ্য-উপাত্তে মানিকুল ইসলাম কানাডায় পাড়ি জমাতে দুবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার বিষয়টি গোপন করেন।

মূলত এমন আলামত পেয়েই কানাডার ইমিগ্রেশন পুলিশ মানিকুল ইসলামকে রেড মার্কে রেখে নজরদারির আওতায় নেয়। এরপরই একে একে বেরিয়ে আসে মানিকুল ইসলামের ভয়াবহ জালিয়াতির বিষয়টি। নথিপত্রে দেখা যায়, ২০১৫ সালে কানাডা যেতে আবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভিসা সেন্টারের প্রয়োজনীয় কিছু নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণ করেন মানিকুল ইসলাম।

সেখানে তিনি শিক্ষাগত যোগ্যতার ছকে উল্লেখ করেন ১৯৯৫ সালে রাজশাহীর চন্দনকাঠা হাইস্কুল থেকে বিজ্ঞানে এসএসসি, ১৯৯৭ সালে গোদাগাড়ি কলেজ থেকে মানবিকে এইচএসসি, ২০০২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিএসএস, ২০০৩ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় ও একই বিষয়ে মাস্টার্স এবং ২০০৭ সালে ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্স (ইউআইটিএস) থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন।

এই আবেদনে তিনি পুলিশে চাকরি করার তথ্য দেন। সিঙ্গাপুরে কানাডার ভিসা সেন্টার অনুসন্ধান করে তার এসব তথ্য জালজালিয়াতি করার প্রমাণ পায়। পুলিশের আইজির কাছে দেওয়া অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা সরেজমিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে খোঁজ নেয়। এসময় মানিকের নামে উত্থাপিত এসব সনদের কোনো অস্তিত্ব পায়নি।

কানাডা ভিসা সেন্টারে জমা দেওয়া প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব সনদ জাল বলে প্রমাণিত হয়। এরপরও তার চাকরি আছে বহাল তবিয়তে।

নারীর সম্ভ্রমহানি : নারীর সম্ভ্রমহানির তালিকা এতই লম্বা যে, হবিগঞ্জের একটি থানায় ওসির দায়িত্বে ছিলেন-এমন একজন পুলিশ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘না হলেও অন্তত একশ নারীর সম্ভ্রম লুট করেছেন এই মানিকুল ইসলাম। অভিযোগ দেওয়া হলে ভয়ভীতি দেখিয়ে আপস করার চেষ্টা করেছেন তিনি।

আবার কোনো কোনো ভিকটিমকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করেছেন। এভাবে এই মানিকুলের কারণে পুলিশের ইমেজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ ওই ওসির একটি অডিও রেকর্ড যুগান্তরের কাছে আসে। এতে বলতে শোনা যায়, মানিকুল ইসলাম হবিগঞ্জে থাকাবস্থায় তৎকালীন তিন পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ উল্লাহ, সেলিম ও রবিউলের আশকারা পেয়ে যা ইচ্ছা তাই করেছেন।

দীর্ঘ অডিওতে এক জায়গায় ওই ওসিকে বলতে শোনা যায়, ‘শায়েস্তাগঞ্জে স্বপন নামে এক মাতালকে ৫শ ইয়াবাসহ গ্রেফতার করেছিলাম। অথচ এই মাতালের দুই বোনের সঙ্গে মানিকুল ইসলাম অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তোলে। তাদের একজন মানিকের সেকেন্ড ও অপরজন থার্ড স্ত্রী হিসাবে পরিচিত।’ এই ঘটনা শায়েস্তাগঞ্জের সবাই জানে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির কাছে এই ওসি নিজেও সাক্ষ্য দিয়েছেন।

নথিপত্রে দেখা যায়, হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের একজন ব্যবসায়ী ইউসুফ আলী নিজের স্ত্রীর সঙ্গেও অবৈধ সম্পর্কের অভিযোগে মনিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে তৎকালীন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্লাহর কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে ইনস্পেকটর মানিকের সার্বক্ষণিক সহযোগী গাড়ি চোরচক্রের সক্রিয় সদস্য দুর্ধর্ষ তারেক মিয়াকেও অভিযুক্ত করেন। ওই ব্যবসায়ীকে ক্রসফায়ারের হুমকিও দেন মানিক।

গুরুতর এমন অভিযোগ পেয়েও তার বিরুদ্ধে ওই সময় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে ভয়ে বিষয়টি আপস-মীমাংসা হলেও ইউসুফ আলী আর ওই স্ত্রীকে ঘরে তুলতে পারেননি। সম্প্রতি তারেককে গাড়ি চুরির মামলায় রাজধানীর কাফরুল এলাকা থেকে ডিবি পুলিশ গ্রেফতার করে। দুর্ধর্ষ এই তারেক জেলহাজতে থাকলেও তার সহযোগী মানিক চাকরিতেই আছেন।

এছাড়া সিরাজগঞ্জে থাকাবস্থায় একজন পৌর কাউন্সিলরের স্ত্রীকেও ভাগিয়ে নিয়ে চলে আসেন মানিক। ওই বিষয়টিও আপস-মীমাংসা করা হয়। সিলেটের একজন ফিজিও থেরাপিস্টকে ধর্ষণের চেষ্টাও করেছেন। ওই ঘটনার পর ভিকটিমের সংসারও ভেঙে গেছে। ওই ফিজিও থেরাপিস্ট এ বিষয়ে সিলেট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলাও করেছেন।

মামলাটি এখন তদন্ত করছেন বালাগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শরীফ নিয়ামত উল্লাহ। হবিগঞ্জের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের একজন নার্সের সম্ভ্রমহানিও করেছেন। লোকলজ্জার ভয়ে তিনি কোনো অভিযোগই করেননি।

কুকর্মের সাক্ষী ভাই : যুগান্তরের দীর্ঘ অনুসন্ধানে এই নারীলোভী মানিকুল ইসলামের অপকর্মের রাজসাক্ষী তারই এক চাচাতো ভাইয়ের সন্ধান পাওয়া যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই যুবক বলেন, ‘মানিকুল ইসলাম কীভাবে টাকা কামাই করেন, তা সবাই জানেন। ওপরদিকে থুতু ফেললে নিজের ওপরই পরে। তার (মানিকুল) এই অবৈধ টাকা কামানোর তালিকায় আমিও ছিলাম। তখন আমি বুঝতে পারিনি।

না বুঝেই অনেক কাজ করে ফেলিছি। মানিকুল ইসলামের বিয়ে প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিয়ে যে কয়টা করেছে আর কয়টা ওর বউ, তা ১, ২, ৩, ৪ হিসাব করে বলতে হবে। তিনি এমন মেয়েকেই বিয়ে করেন বা প্রতারণার মাধ্যমে সম্ভ্রম লুট করেন, যার প্রতিবাদ করার কোনো সুযোগ বা শক্তি নেই। আক্ষেপ করে এই যুবক বলেন, ‘মানিক এমনই একজন বড় ভাই, যে ছোট ভাইয়ের স্ত্রীকে ছেড়ে দিতে সম্পত্তিও আটকে রাখেন।’

এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে ওই যুবক বলেন, ‘বড় ভাইয়েরা সব সময় বলেন-স্ত্রী নিয়ে সুখে-শান্তিতে থাকো। আর মানিকুল এমনই এক ভাই, যে কিনা আমাকে দিয়ে খারাপ কাজ করানোর জন্য আমার স্ত্রীকে ছেড়ে দিতে বলেছেন। কারণ আমার স্ত্রী ছিলেন শিক্ষিত। খারাপ কাজ করতে বাধা দেবে, এ কারণে স্ত্রীকে ছেড়ে দিতে বলেছেন। তার এ কথা না শোনায় মনে মনে প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেন।

আমার একটা জমিও তিনি নিয়ে নেন। একসময় বলতে থাকেন, বউ ছেড়ে দাও, নাহলে সম্পত্তিও পাবে না।’ সেই স্ত্রীও এখন আমার সঙ্গে নেই। ঠিকই ছাড়াছাড়ি হয়েছে।

গুরুতর অভিযোগেও তিরস্কার : তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ১৭ বছরের চাকরিজীবনে মানিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর ১৩টি অভিযোগ প্রমাণ পেয়েছেন পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা, যা আইন প্রয়োগকারী একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিন্তু বারবার তাকে সর্বনিম্ন সাজা ‘তিরস্কার’ করে অভিযোগের সব ফাইল ধামাচাপা দেওয়া হয়। অথচ যেসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, তা আমলে নেওয়া হলে তার চাকরিই থাকার নয়।

মানিকুল ইসলামের বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার শ্রীমন্তপুর গ্রামে। তার বাবার নাম আবুল কাশেম। ২০০৪ সালের ১ নভেম্বর এসআই (নিরস্ত্র) পদে পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করেন মানিকুল ইসলাম। বিএনপির তৎকালীন মন্ত্রী রাজশাহীর আমিনুল ইসলামের তদবিরে তার চাকরি হয়। এই পদে তার প্রথম পোস্টিং রাজশাহী মহানগরীর রাজপাড়া থানায়। এরপর ২০০৭ সালের ১৪ আগস্ট সিলেট রেঞ্জে বদলি হয়ে আসেন।

এর দুইদিন পরই হবিগঞ্জের মাধবপুর থানায় এসআই হিসাবে যোগদানও করেন। ২০০৯ সালের ১৭ এপ্রিল তাকে বদলি করা হয় সিলেট জেলা ডিএসবিতে। এরপর হবিগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, আবারও সিলেট ডিএসবি, হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ, ডিবি, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ পুলিশ লাইনস, রাজশাহী রেঞ্জ অফিস, সিরাজগঞ্জ ডিবি ও রংপুর রেঞ্জ অফিসে কর্মরত ছিলেন। ১৭ বছরের চাকরিজীবনে তিনি প্রশংসা পেয়েছেন একটি।

আর তিরস্কার পেয়েছেন ১৩ বার। ২০০৭ সালে মানিকুলের ঝুলিতে প্রথম তিরস্কারের তকমা যোগ হয়, তখন তিনি হবিগঞ্জের মাধবপুরে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই সময়ে কর্মরত একজন সহকর্মী যুগান্তরকে বলেন, অহেতুক ওয়াকিটকি নিয়ে ঘোরাফেরা করতেন মানিকুল ইসলাম। বিশেষ করে মেয়েদের দেখলেই তিনি ওয়াকিটকি নিয়ে অঙ্গভঙ্গি করতেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হবিগঞ্জের মাধবপুরে কর্মরত থাকাবস্থায় ২০০৭ সালের ২৭ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে অহেতুক ওয়াকিটকি দিয়ে প্রেম করায় তার কাছে কৈফিয়ত তলব করা হয়। এ ঘটনায় ২৯ মে তাকে তিরস্কার করা হয়। একই থানায় থাকাবস্থায় একই বছরের ২৬ নভেম্বর তৎকালীন পুলিশ সুপারের নির্দেশ অমান্য ও দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে তাকে দ্বিতীয়বার তিরস্কার করা হয়।

২০০৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তৃতীয়বার তিরস্কার পান। মাধবপুর থানার মামলার (নং ১৬(৮) ২০০৮) আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিলে গড়িমসির কারণে চতুর্থবার তিরস্কার করা হয়। ২০০৯ সালের ৯ জুলাই থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওয়ারেন্ট তামিল সন্তোষজনক না হওয়ায় পঞ্চমবারের মতো তিরস্কার করা হয়। একই বছরের ২৬ নভেম্বর ৪ মাসের গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিলে ব্যর্থতার কারণে ষষ্ঠবার তিরস্কার পান।

২০১০ সালে সিলেটের ওসমানীনগর থানায় কর্মরত থাকাবস্থায় ৮ মার্চ অদক্ষতার কারণে ৭ম তিরস্কার করা হয়। একই থানায় থাকাবস্থায় ২০১০ সালের ২২ মার্চ অষ্টমবার তিরস্কার পান। সিলেট সদর থানায় ২০০৯ সালের ২ জানুয়ারি দায়ের করা ৪নং মামলাটি তদন্তের দয়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। ওই মামলাটি তদন্তে গাফিলতির প্রমাণ পান ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এই অভিযোগে তার কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হয়।

জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় নবম তিরস্কার করা হয় তাকে। ২০১২ সালের ৮ মার্চ সিলেট মডেল থানার একটি অভিযোগ (স্মারক নং ১৬৩৭) তদন্তের পর প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। প্রতিবেদনটি অনুসন্ধানের ভিত্তিতে জানা যায়, মানিকুল ইসলাম ফোর্সদের অসভ্য ভাষায় গালগাল করেন। এমন গুরুতর অভিযোগ প্রমাণের পরও তাকে ১০ নম্বর তিরস্কার করা হয়।

মানিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ভয়াবহ গুরুদণ্ডের ৩টি অভিযোগ পাওয়া যায় সিরাজগঞ্জে। ২০১৪ সালের ১৩ জুলাই সিরাজগঞ্জ থানায় দায়েরকৃত ৩৮নং মামলাটি তদন্ত করেন তিনি। এ সময় আসামিদের পক্ষ নিয়ে কাজ করার অভিযোগ ওঠে। এরপর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তার গাফিলতির প্রমাণ পান। মানিকুল ইসলাম সংশ্লিষ্ট মামলার কোনো আসামিকে গ্রেফতার না করে চার্জশিট দাখিল করে ১১ বারের মতো তিরস্কার পান ২০১৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি।

২০১৪ সালের ১ আগস্ট দায়ের করা ৩নং মামলার চার্জশিট দখিল করেছেন মূল আসামিদের বাদ দিয়ে। সংশ্লিষ্ট মামলাটির প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের জবানবন্দি অনুযায়ী সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ না করে মূল আসামিদের হত্যার দায় থেকে বাঁচাতে চার্জশিট দেওয়া হয়।

এরপর বিশ্বাসভঙ্গের এমন গুরুতর অভিযোগ এনে ২০১৫ সালের ১৫ অক্টোবর ১২ নম্বর তিরস্কার করা হয়। ১৩নং তিরস্কারটিও আসে সিরাজগঞ্জ সদর থানায় কর্মরত অবস্থায় ২০১৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। অথচ সর্বশেষ তিরস্কার পাওয়ার ৮ মাসের মাথায় ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর পদোন্নতি পেয়ে ইনস্পেকটর হয়েছেন এই মানিকুল ইসলাম।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে পরিদর্শক (সাময়িক বরখাস্ত) মানিকুল ইসলামের সঙ্গে ব্যক্তিগত মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সংযোগ স্থাপন করেননি। পরে অভিযোগের সারসংক্ষেপ উল্লেখ করে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে তার বক্তব্য চাওয়া হয়। কিন্তু তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

শেয়ার করুন