১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৬:৩৪:১০ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
প্রতিশোধ নয়, ক্ষমাই হোক মানবিকতার পরিচয়
  • আপডেট করা হয়েছে : ১১-১০-২০২৬
প্রতিশোধ নয়, ক্ষমাই হোক মানবিকতার পরিচয়

মানুষ মাত্রই ভুল করে। কখনো রাগের বশে প্রিয়জনকে কষ্ট দেয়, কখনো অহংকারে অন্যের যুক্তি উপেক্ষা করে, আবার কখনো নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করে। কিন্তু ভুল করাই মানুষের জীবনের চূড়ান্ত পরিচয় নয়; বরং ভুলের পর সে কীভাবে নিজেকে সংশোধন করে, সেটিই তার নৈতিকতা ও ব্যক্তিত্বের প্রকৃত পরিচয় বহন করে। নিজের অন্যায় অস্বীকার করা, ভুলের দায় অন্যের ওপর চাপানো কিংবা প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষায় অটল থাকা মানুষকে আরও বড় অন্যায়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে। বিপরীতে, ভুল স্বীকার করে অনুতপ্ত হওয়া এবং সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপ। ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, এটি মানুষকে নিষ্পাপ হওয়ার দাবি করতে শেখায় না; বরং ভুলের পর মহান আল্লাহর কাছে ফিরে আসার পথ দেখায়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন।’ (সুরা আজ-জুমার, আয়াত ৫৩)। এই বাণী হতাশ মানুষের জন্য আশার আলো এবং অপরাধে লিপ্ত ব্যক্তির জন্য সংশোধনের আহ্বান। তবে আল্লাহর ক্ষমার প্রত্যাশা কখনো অন্যায়কে অব্যাহত রাখার অজুহাত হতে পারে না। প্রকৃত অনুতাপ মানুষকে ভুলের পথ থেকে ফিরিয়ে এনে ন্যায় ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করে।


তওবা: আল্লাহর রহমত লাভের পথ : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আদমসন্তান প্রত্যেকেই ভুলকারী; আর ভুলকারীদের মধ্যে উত্তম হলো যারা তওবা করে।’ (জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ২৪৯৯)। এই হাদিস মানুষের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করার পাশাপাশি অনুতাপ ও আত্মসংশোধনের গুরুত্ব তুলে ধরে। প্রকৃত তওবার জন্য শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়া যথেষ্ট নয়; সংশ্লিষ্ট গুনাহ পরিত্যাগ করা, আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হওয়া এবং পুনরায় সেই অন্যায় না করার দৃঢ় সংকল্প থাকা প্রয়োজন। আর অন্যের অধিকার নষ্ট হয়ে থাকলে যথাসম্ভব তা ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষতিপূরণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কেউ অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেন, অথচ সম্পদ ফিরিয়ে দিলেন না—এতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। একইভাবে কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিলে তা প্রত্যাহার করা এবং তাঁর সম্মান পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করাও দায়িত্বের অংশ। সুতরাং তওবা নিছক আবেগের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দায়িত্ববোধ, সততা ও বাস্তব পরিবর্তন। আল্লাহর রহমতের প্রতি আস্থা মানুষকে হতাশা থেকে রক্ষা করে, আর তওবার অঙ্গীকার তাকে নিজের আচরণ সংশোধনে উদ্বুদ্ধ করে। যে ব্যক্তি নিজের ভুল বুঝে ফিরে আসতে পারে, তার সামনে নতুনভাবে জীবন গড়ার সুযোগ তৈরি হয়।


আদম (আ.) ও ইবলিস: ভুলের পর প্রত্যাবর্তন বনাম অহংকার : পবিত্র কোরআনে আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-এর অনুতাপের ঘটনা মানবজাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। তাঁরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, ‘হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।’ (সুরা আল-আ‘রাফ, আয়াত ২৩)। অন্যদিকে, ইবলিস আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার পর অহংকার ও আত্মম্ভরিতায় অটল ছিল। নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাওয়ার পরিবর্তে সে নিজের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করিয়েছিল। এই দুই ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়: ভুল করা এক বিষয়, আর ভুলের পরও অহংকারের সঙ্গে অন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। মানুষ ভুলের কারণে পথ হারাতে পারে, কিন্তু অনুতাপ তাকে সঠিক পথে ফিরে আসার সুযোগ দেয়। বিপরীতে, আত্মপ্রবঞ্চনা ও অন্যকে দোষারোপ করার প্রবণতা সংশোধনের পথ বন্ধ করে দেয়। পরিবার, বন্ধুত্ব, কর্মক্ষেত্র কিংবা সামাজিক জীবনে এই শিক্ষা সমানভাবে প্রযোজ্য। নিজের ভুল বুঝতে পারা এবং সত্যের সামনে নত হতে পারা কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটি আত্মিক শক্তির পরিচয়। যে মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতে শেখে, সে অন্যের প্রতিও অধিক সহানুভূতিশীল হতে পারে।


রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিদের জীবন থেকে ক্ষমার শিক্ষা : 

ক্ষমা ও মহানুভবতার অন্যতম ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত মক্কা বিজয়। দীর্ঘ নির্যাতন, বিরোধ ও হিজরতের অভিজ্ঞতার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন বিজয়ীর বেশে মক্কায় ফিরে আসেন, তখন ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার পরিবর্তে ক্ষমা ও সংযমের শিক্ষা তাঁর আচরণে বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়। এই ঘটনা মুসলমানদের মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতা অর্জনের পর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সংযম প্রদর্শন করা মহত্ত্বের পরিচয়। সাহাবিদের জীবনেও ভুল স্বীকার ও ক্ষমা চাওয়ার মূল্যবান দৃষ্টান্ত রয়েছে। সহিহ বুখারির ৪৬৪০ নম্বর হাদিসে আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.)-এর মধ্যে মতবিরোধের একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে মনোমালিন্য সৃষ্টি হলে আবু বকর (রা.) উমর (রা.)-এর কাছে ক্ষমা চাইতে এগিয়ে যান। এই ঘটনা আমাদের শেখায়, মর্যাদাবান মানুষও মতপার্থক্যে জড়াতে পারেন; কিন্তু মহত্ত্ব প্রকাশ পায় নিজের ভুলের দায় স্বীকার ও সম্পর্ক পুনর্গঠনের আন্তরিকতায়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ এবং সাহাবিদের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদেরও ব্যক্তিগত বিরোধে সংযমী হওয়া, অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা এবং ক্ষমা চাওয়ার ক্ষেত্রে অহংকার পরিহার করা উচিত। তবে ক্ষমা মানে অন্যায়কে সমর্থন করা নয়; বরং ন্যায়বিচারের সীমার মধ্যে প্রতিহিংসা থেকে নিজেকে বিরত রাখা।


ক্ষমা ও ন্যায়বিচার: ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ নির্দেশনা : 

ইসলামে ক্ষমাশীলতার গুরুত্ব অপরিসীম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে; আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৪)। কিন্তু এই শিক্ষা ন্যায়বিচারের প্রয়োজনীয়তাকে বাতিল করে না। পবিত্র কোরআনে ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও সত্যের পক্ষে অবিচল থাকার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে (সুরা আন-নিসা, আয়াত ১৩৫)। ব্যক্তিগত অপমান, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা অনিচ্ছাকৃত আচরণের ক্ষেত্রে ক্ষমা সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথ খুলে দিতে পারে। কিন্তু নির্যাতন, প্রতারণা, দুর্নীতি বা অন্যের অধিকার হরণের মতো ঘটনায় শুধু ক্ষমার কথা বলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। ক্ষমা ও জবাবদিহি পরস্পরের বিরোধী নয়; বরং সঠিক প্রয়োগে তারা একে অন্যের পরিপূরক। অন্যায়ের শিকার ব্যক্তি ব্যক্তিগত ক্ষোভ পরিহার করতে পারেন, আবার আইনসম্মত প্রতিকারও চাইতে পারেন। অপরাধের বিচার হওয়া প্রতিশোধের সমার্থক নয়; এটি অধিকার রক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। একইভাবে কাউকে ক্ষমা করার জন্য ভুক্তভোগীর ওপর চাপ সৃষ্টি করাও অনুচিত। ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা হলো—নিজের ক্রোধ সংযত করা, অন্যকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া এবং একই সঙ্গে সত্য, ন্যায় ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকা।


আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ক্ষমা: মানসিক সুস্থতার সহায়ক : 

ক্ষমা শুধু ধর্মীয় অনুশাসন নয়; আধুনিক মনোবিজ্ঞানেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়। বিভিন্ন গবেষণা ও পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পরিকল্পিত ক্ষমাভিত্তিক মনস্তাত্ত্বিক অনুশীলন কিছু মানুষের রাগ, শত্রুভাবাপন্নতা, বিষণ্নতার উপসর্গ ও মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণেও ক্ষমাভিত্তিক হস্তক্ষেপের সঙ্গে মানসিক সুস্থতার কয়েকটি ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে, কাউকে ক্ষমা করলেই সব মানসিক কষ্ট দূর হয়ে যায় কিংবা ক্ষমা করতে সময় লাগলে মানুষটি নৈতিকভাবে দুর্বল। গভীর আঘাত থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময়, নিরাপত্তা, সামাজিক সহায়তা এবং প্রয়োজনে পেশাদার পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে। ক্ষমা মানে অন্যায়ের স্মৃতি মুছে ফেলা কিংবা অপরাধীর ওপর আগের মতোই আস্থা স্থাপন করা নয়। বরং প্রতিশোধস্পৃহা ও ক্ষোভ যেন নিজের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সে বিষয়ে সচেতন হওয়া। ইসলাম যে ক্রোধ সংবরণ, আত্মশুদ্ধি ও ক্ষমার শিক্ষা দেয়, আধুনিক মনোবিজ্ঞানের কিছু গবেষণাও তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উপলব্ধি তুলে ধরে। এ শিক্ষা ব্যক্তিগত জীবনে মানসিক ভারসাম্য রক্ষা, সম্পর্কের উন্নতি এবং সংঘাত মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।


পরিবার, আত্মীয়তা ও বন্ধুত্বে ক্ষমার বাস্তব প্রয়োগ : পরিবার মানুষের প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানেই ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা ও ক্ষমাশীলতার চর্চা শুরু হয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ, সন্তানকে শাসন করতে গিয়ে অন্যায় আচরণ, ভাইবোনের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ কিংবা আত্মীয়স্বজনের কথায় কষ্ট পাওয়া—এসব পরিস্থিতিতে ভুল স্বীকার ও ক্ষমা চাওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। একজন অভিভাবক সন্তানের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করলে দুঃখ প্রকাশ করতে পারেন; এতে তাঁর মর্যাদা কমে না, বরং সন্তানের কাছে সততা ও আত্মসমালোচনার উদাহরণ তৈরি হয়। একইভাবে আত্মীয়তার বিরোধে পুরোনো অভিযোগ বারবার সামনে না এনে ন্যায়সংগত সমাধান খোঁজা প্রয়োজন। বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও বিশ্বাস ভঙ্গ বা ভুল বোঝাবুঝির পর আন্তরিক কথোপকথন অনেক দূরত্ব কমাতে পারে। তবে বারবার প্রতারণা বা নির্যাতনের শিকার হলে নিরাপদ সীমারেখা বজায় রাখা জরুরি। ক্ষমা করার অর্থ সবকিছু আগের মতো মেনে নেওয়া নয়; বরং নিজের মানসিক শান্তি ও মর্যাদা রক্ষা করে বিদ্বেষের ভার থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা। পরিবারের সদস্যরা যদি একে অন্যের ভুলকে সংশোধনের সুযোগ হিসেবে দেখেন, তাহলে সম্পর্কের ভিত মজবুত হয়। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের ক্ষেত্রেও সহমর্মিতা, দায়িত্বশীল আচরণ এবং পারস্পরিক সম্মান দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করে।


কর্মক্ষেত্র ও রাজনীতিতে ক্ষমা, জবাবদিহি ও সহাবস্থান : 

কর্মক্ষেত্রে ভুলের প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও মানুষের অধিকারকেও প্রভাবিত করতে পারে। তাই ভুলের কারণ নির্ধারণ, ক্ষতি সংশোধন এবং ভবিষ্যতে একই ঘটনা প্রতিরোধ করা জরুরি। অনিচ্ছাকৃত ভুল ও ইচ্ছাকৃত অসদাচরণকে একভাবে বিচার করা উচিত নয়। ভুল স্বীকারকারী কর্মীকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে; অন্যদিকে দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক জীবনেও একই নীতি প্রযোজ্য। একই দলের সহযোদ্ধাদের মধ্যে পদ-পদবি বা সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধ হতে পারে; আবার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে মতপার্থক্যও স্বাভাবিক। কিন্তু মতবিরোধকে ব্যক্তিগত শত্রুতা, অপমান কিংবা প্রতিশোধের রাজনীতিতে পরিণত করা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০১৩ সালে প্রকাশ্যে প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার ও ক্ষমার বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন। তারেক রহমানও বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবর্তে জবাবদিহি, পুনর্মিলন ও গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এসব বক্তব্যের বৃহত্তর শিক্ষা হলো, রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে ব্যক্তিগত প্রতিশোধের পরিবর্তে সংলাপ, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে প্রকৃত পুনর্মিলনের জন্য অন্যায়ের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, ভুক্তভোগীর অধিকার রক্ষা এবং অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংযম ও আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনা প্রকাশ করা সহজ হয়ে উঠেছে। কখনো মানুষ অতীতের ভুল বা গুনাহকে আকর্ষণীয় গল্প হিসেবে প্রচার করে, আবার কখনো অন্যের গোপনীয়তা প্রকাশ করে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করে। ইসলামে অশ্লীলতা ও অন্যায় প্রচারের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে (সুরা আন-নূর, আয়াত ১৯)। সহিহ বুখারির ৬০৬৯ নম্বর হাদিসেও প্রকাশ্যে নিজের গুনাহ প্রচার করার বিষয়ে সতর্কবাণী রয়েছে। তবে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ন্যায়বিচারের জন্য ঘটনা প্রকাশ করলে কিংবা কেউ প্রতারণা থেকে অন্যদের সতর্ক করলে সেটিকে নিজের গুনাহ প্রচারের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। উদ্দেশ্য, প্রেক্ষাপট ও সম্ভাব্য ক্ষতি বিবেচনা করা জরুরি। অতীতের ভুল সংশোধনের জন্য প্রত্যেক ব্যক্তির সব গোপন বিষয় জনসমক্ষে প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই; বরং আন্তরিক তওবা, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ আচরণ পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অন্যের ভুলকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে তাকে চিরস্থায়ীভাবে অপমান করাও অনুচিত। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা, দায়িত্বশীল বক্তব্য এবং তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস ডিজিটাল সমাজকে আরও মানবিক করে তুলতে পারে।


আত্মশুদ্ধির অঙ্গীকার: প্রতিশোধ নয়, ক্ষমার সংস্কৃতি : 

ক্ষমাশীলতা বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, ভুল বুঝতে পারলে অজুহাত না দেখিয়ে নিজের দায় স্বীকার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে এবং একই ভুল পুনরাবৃত্তি না করার চেষ্টা করতে হবে। তৃতীয়ত, অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে যথাসম্ভব ক্ষতিপূরণ ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। পঞ্চমত, অন্যের ভুলের ক্ষেত্রে প্রতিশোধস্পৃহা সংযত রেখে সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে; তবে ন্যায়বিচার ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। আমাদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় পরিসর পর্যন্ত অহংকার, অসহিষ্ণুতা ও প্রতিহিংসা বহু সংকটের জন্ম দেয়। পরিবারে ক্ষমা সম্পর্ক রক্ষা করে, কর্মক্ষেত্রে আত্মসমালোচনা দক্ষতা বাড়ায় এবং রাজনীতিতে সহনশীলতা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়া—দুটিই আত্মশুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যদিকে, অন্যকে ক্ষমা করা মানে অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া নয়; বরং নিজের ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করে ন্যায়সংগত ও মানবিক পথ বেছে নেওয়া। পবিত্র কোরআনের সেই প্রার্থনা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পথ দেখাক: ‘হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।’ (সুরা আল-আ‘রাফ, আয়াত ২৩)। মহান আল্লাহ আমাদের আন্তরিক তওবা, আত্মশুদ্ধি, ন্যায়বিচার ও ক্ষমাশীলতার গুণে সমৃদ্ধ করুন। আমিন।


শেয়ার করুন