প্রবাসে বসবাস করলেও ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি টান কমেনি বাংলাদেশিদের। দুবাই বাংলাদেশ কনসুলেট এবারের অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে প্রবাসীদের জন্য নান্দনিক আয়োজনের ব্যবস্থা করেছে। তবে এই আয়োজন প্রবাসীদের কাছে কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে? এ বিষয়ে জানতে কথা হয় দুবাই প্রবাসী সোনিয়া আকতার মুনের সঙ্গে।
দুবাইয়ের এক রেস্তোরাঁয় খেতে বসে থাকা সোনিয়া আকতার মুনকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, 'আপনি একুশে ফেব্রুয়ারি কিভাবে দেখেন?' প্রথমে তিনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলেন, 'ভাই, এসব দিবস টিবস কি মাথায় থাকে?' কিন্তু পরক্ষণেই হেসে উঠে বলেন, 'তবে হ্যাঁ, ব্যবসার কাজে কিংবা প্রতিদিনের জীবনে আমি সবসময় বাংলার খোঁজ করি। বাংলায় কথা বলতে পারলে আনন্দ পাই।'
তিনি আরও জানান, 'গতকাল এক পাকিস্তানি দোকানদারকে বাংলায় বকা দিয়েছি। সে বলল, ‘বাংলা নেহি, উর্দু বলো।’ আমি বললাম, 'আমি উর্দু বলব না, তুমি বাংলায় বলো!'
সোনিয়া আকতার মুন নারায়ণগঞ্জের মেয়ে। করোনা পরবর্তী সময়ে দুবাই ঘুরতে এসে ব্যবসার প্রতি আগ্রহী হন। স্বামী মালয়েশিয়ায় থাকলেও, তিনি একাই দুবাইয়ের দেইরা এলাকায় গার্মেন্টস ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। পুরুষপ্রধান সমাজে পরিবার ও শ্বশুরবাড়ির চাপ উপেক্ষা করেও নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকে তিনি এগিয়ে চলেছেন।
তার বিশ্বাস, 'নারী হয়েছি বলে কি? ব্যবসা আমি পারবই। পরিশ্রমই আমাকে সফলতা এনে দেবে।'
একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে সোনিয়া বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু ভাষার অধিকার অর্জনের দিন নয়, এটি বাঙালির জাতীয় আত্মপরিচয়েরও প্রতীক। ভাষা আন্দোলনে শহিদদের রক্তের বিনিময়ে আমরা বাংলা ভাষার স্বীকৃতি পেয়েছি। কিন্তু আজ প্রবাসে কিংবা দেশেই আমরা কি সত্যিই আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে পারছি?
তিনি আরও বলেন, প্রবাসীদের ভাষার প্রতি ভালোবাসা যেমন স্পষ্ট, তেমনই ব্যস্ত জীবনের বাস্তবতাও এই অনুভূতিকে কিছুটা ছাপিয়ে যাচ্ছে। তবু, যেখানে থাকি, যেভাবেই থাকি—মায়ের ভাষাকে হৃদয়ে ধারণ করাই একুশের প্রকৃত শিক্ষা।
দুবাইয়ের উত্তর আমিরাতের বাংলাদেশ কনসুলেটে কনসাল জেনারেল মো. রাশেদুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে এক বিশেষ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও মিশরের কনসুলেটরাও অংশ নেন। অনুষ্ঠানে প্রত্যেক দেশই নিজেদের সংস্কৃতি উপস্থাপন করে, যা পুরো আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
তবে আয়োজনে কমিউনিটির অংশগ্রহণ আগের মতো ভরপুর ছিল না। এ বিষয়ে কনসাল জেনারেল রাশেদুজ্জামান বলেন, 'আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি, তাই সবাইকে জানার বিষয় আছে। তাছাড়া বেশি মানুষের চাপ সামলানো নিয়ে কিছুটা সংশয় ছিল, তাই এবার স্বল্প পরিসরে আয়োজন করেছি। তবে আমরা ভালো আয়োজনের চেষ্টা করেছি।'
২০২৪ সালের ভাষা আন্দোলনের পর এবারই প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন করল আমিরাতের বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনসুলেট। সারাদিনের কর্মসূচির মধ্যে ছিল— ভোরে শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ। একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে আলোচনা সভা। ১৯৫২ ও ২০২৪ সালের শহিদদের স্মরণে ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী। পরিশেষে মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
রাষ্ট্রদূত তারেক আহমেদ ও কনসাল জেনারেল রাশেদুজ্জামানের নেতৃত্বে এসব কর্মসূচি পালন করা হয়।