১৯ জুলাই ২০২৬, রবিবার, ০৬:৪৮:৪৩ অপরাহ্ন
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী অংশে খানাখন্দের দাপট, ৭ মাসে প্রাণ গেল ৩৭ জনের
স্টাফ রিপোর্টার :
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৯-০৭-২০২৬
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী অংশে খানাখন্দের দাপট, ৭ মাসে প্রাণ গেল ৩৭ জনের

দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী অংশের প্রায় ২৭ কিলোমিটার এখন পরিণত হয়েছে খানাখন্দ আর দুর্ঘটনার করিডোরে। টানা বর্ষণে সড়কের বিভিন্ন স্থানে কার্পেটিং উঠে গিয়ে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। কোথাও আবার বৃষ্টির পানিতে গর্তগুলো ডুবে থাকায় প্রতিদিন চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন হাজারো মানুষ। ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা, ঝরছে প্রাণও।

শনিবার (১৮ জুলাই) সরেজমিনে মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নতুন সমিতি বাজার থেকে মুহুরীগঞ্জ, কসকা থেকে লেমুয়া সেতু এবং লেমুয়া সেতু থেকে লালপোল পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। গর্তগুলোতে পানি জমে থাকায় চালকদের জন্য সেগুলো শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও অন্যান্য ছোট যানবাহনের চালকরা। গর্ত এড়াতে গিয়ে অনেক চালক হঠাৎ লেন পরিবর্তন করছেন, এতে দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কাও বাড়ছে।

মহাসড়কের মুহুরী সেতু থেকে কসকা পর্যন্ত কয়েকটি স্থানে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ ইট ও কার্পেটিং দিয়ে সাময়িক সংস্কার করলেও অনেক জায়গায় ভরাট করা অংশ সমতল না হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

ধীরগতি, যানজট ও বাড়তি দুর্ভোগ

চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের কারণে যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করছে। ফলে প্রায়ই যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পণ্যবাহী যানবাহনের যাতায়াতে সময় যেমন বাড়ছে, তেমনি বেড়েছে জ্বালানি খরচ ও যানবাহনের যান্ত্রিক ক্ষয়ক্ষতিও।

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স, নারী, শিশু এবং দূরপাল্লার যাত্রীরা।

চালক ও যাত্রীদের অভিযোগ, প্রতি বর্ষা মৌসুমেই বিশেষ করে ঢাকামুখী লেনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে সাময়িক সংস্কার করা হলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ না থাকায় বছর ঘুরে একই দুর্ভোগ ফিরে আসে।

চালকদের অভিজ্ঞতা

বাসচালক রেজাউল করিম বলেন, “বারৈয়ারহাট থেকে মহিপাল পর্যন্ত আসতে এখন স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে। খানাখন্দের কারণে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। সামান্য অসাবধান হলেই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”

মোটরসাইকেল চালক সায়েম চৌধুরী বলেন, “এক-দুটি গর্ত হলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু পুরো চট্টগ্রামমুখী লেনজুড়েই ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত। অনেক জায়গায় পানি জমে থাকায় গর্ত বোঝা যায় না। মোটরসাইকেল চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।”

দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) ফেনী জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান দারা বলেন, চালকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের চলাচল, অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন এবং বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

তার মতে, ফেনীর সড়কে যানবাহনের চাপও তুলনামূলক বেশি। পাশাপাশি হাইওয়ে পুলিশের কার্যকর নজরদারি আরও জোরদার করা গেলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

সাত মাসে প্রাণহানি ৩৭

হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী অংশে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৩৭ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ রয়েছেন। একই সময়ে এসব দুর্ঘটনায় ৩৫টি মামলা হয়েছে।

ফাজিলপুর হাইওয়ে থানার তথ্যমতে, তাদের আওতাধীন এলাকায় সাত মাসে ১১টি দুর্ঘটনা মামলায় ৯ জন নিহত ও ৭ জন আহত হয়েছেন।

অন্যদিকে মহিপাল হাইওয়ে থানার আওতাধীন এলাকায় একই সময়ে ২৪টি মামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৮ জন।

ফাজিলপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম বলেন, “বেপরোয়া গতি ও সার্ভিস লেনের অভাব দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। বর্ষায় সড়কে খানাখন্দ সৃষ্টি হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং যানজট—দুটোই বেড়ে যায়।”

মহিপাল হাইওয়ে থানার ওসি মো. আছাদুল ইসলাম বলেন, “দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর কারণে অনেক চালক ক্লান্ত ও তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। এর ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। তবে মহিপাল এলাকায় যেসব স্থানে বর্ষায় গর্ত সৃষ্টি হয়েছিল, সেগুলো দ্রুত সংস্কার করায় বর্তমানে ঝুঁকি কিছুটা কমেছে।”

যা বলছে সড়ক বিভাগ

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মহাসড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে সংস্কারকাজ চলমান রয়েছে। বৃষ্টি না হলে আগামী দুই দিনের মধ্যেই কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে বিভাগটি।

সওজ ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীতি চাকমা বলেন, “টানা বৃষ্টির কারণে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি স্থানে সংস্কার শেষ হয়েছে, বাকি অংশেও কাজ চলছে। আগামী দুই দিন আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে পুরো কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।”

তিনি আরও বলেন, “ঢাকামুখী লেনেই মূলত বেশি সমস্যা দেখা দেয়। কারণ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আসা ভারী পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ এই লেনেই বেশি থাকে। টানা বৃষ্টির মধ্যে ভারী যানবাহন চলাচলের কারণেই সড়কের ক্ষতি বাড়ে। তুলনামূলকভাবে চট্টগ্রামমুখী লেনে ক্ষয়ক্ষতি কম।”

শেয়ার করুন