ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ ২০২৫ নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে উত্থাপিত বিতর্ক ও প্রশ্নের জবাবে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংগঠনগুলোর জাতীয় নেটওয়ার্ক ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ)। সংগঠনটির দাবি, প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ ক্ষুদ্রঋণ-বিরোধী বা মুনাফাভিত্তিক কোনো উদ্যোগ নয়; বরং এটি ক্ষুদ্রঋণ খাতকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সিডিএফ জানায়, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশের মূল দর্শনের সঙ্গে ‘মুনাফাভিত্তিক ব্যাংক’ বা ‘ক্ষুদ্রঋণের মূল লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়ার’ আশঙ্কার কোনো সামঞ্জস্য নেই।
সিডিএফের মতে, প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক একটি সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হবে—এ বিষয়টি অধ্যাদেশের খসড়াতেই সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। খসড়ার ৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ব্যাংকটি সামাজিক ব্যবসার নীতিতে পরিচালিত হবে এবং বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগের অতিরিক্ত কোনো লভ্যাংশ গ্রহণ করতে পারবেন না। ফলে এটিকে মুনাফাভিত্তিক বা ব্যক্তিমালিকানার উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
গণমাধ্যমে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো—ব্যাংক কাঠামোয় গেলে ক্ষুদ্রঋণের মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে কি না। এ বিষয়ে সিডিএফ বলছে, প্রস্তাবিত ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য হবে দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও কুটির শিল্পের বিকাশে সহায়তা করা। ব্যাংকটির কার্যক্রম কেবল ঋণ কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর আওতায় ইনস্যুরেন্স সেবা, রেমিট্যান্স, দেশি-বিদেশি অনুদান ও ঋণ গ্রহণের সুযোগ থাকবে। পাশাপাশি কৃষি খাতে ঋণের পরিধিও সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।
এনজিও ও ব্যাংকের দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সে প্রসঙ্গে সিডিএফ জানায়, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক আইন কার্যকর হলেও কোনো এনজিওকে বাধ্যতামূলকভাবে ব্যাংকে রূপান্তর করা হবে না। কোনো সংস্থা চাইলে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে তাদের কার্যক্রম ব্যাংকের আওতায় আনতে পারবে। তবে ব্যাংকে রূপান্তরিত অংশটি হবে সম্পূর্ণ আলাদা কাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এবং সেটির নিয়ন্ত্রণ থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে। অপরদিকে এনজিও অংশটি থাকবে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)-এর তত্ত্বাবধানে। ফলে একই কাঠামোয় দ্বৈত নিয়ন্ত্রণের কোনো সুযোগ নেই।
এসেট বা সম্পদ স্থানান্তর নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে উল্লেখ করে সিডিএফ জানায়, কোনো এনজিওর যে অংশটুকু ব্যাংকে রূপান্তর হবে, কেবল সেই অংশের সম্পদ ও দায়-দেনাই স্থানান্তরিত হবে। সব সম্পদ একসঙ্গে ব্যাংকে চলে যাবে—এমন কোনো বিধান অধ্যাদেশে নেই।
প্রস্তাবিত ব্যাংকের মালিকানা কাঠামোকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সিডিএফ। তাদের মতে, ব্যাংকের মোট শেয়ারের ৬০ শতাংশ থাকবে দরিদ্র সদস্যদের মালিকানায়। ফলে ক্ষুদ্রঋণের মূল লক্ষ্য গোষ্ঠীই হবে ব্যাংকের প্রধান শেয়ারহোল্ডার। এতে দরিদ্র সদস্যদের ক্ষমতায়ন হবে এবং ব্যাংকের সম্ভাব্য উদ্বৃত্তের সুফলও তারা সরাসরি পাবে।
এ ক্ষেত্রে গ্রামীণ ব্যাংকের উদাহরণ টেনে সিডিএফ বলছে, সেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ শেয়ার দরিদ্র সদস্যদের হাতে রয়েছে, যা একটি সফল মডেল হিসেবে বিবেচিত।
সিডিএফ আরও জানায়, প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকে বিনিয়োগকারীরা কেবল তাদের বিনিয়োগকৃত মূলধনের সমপরিমাণ অর্থ ফেরত পাবেন। অতিরিক্ত মুনাফা বা ডিভিডেন্ডের সুযোগ না থাকায় ব্যক্তি মুনাফার আশায় কেউ এ ধরনের ব্যাংকে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন না। ফলে অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ শেয়ারের বিনিয়োগ মূলত বিভিন্ন এনজিওর উদ্বৃত্ত তহবিল থেকেই আসবে এবং ব্যাংকের যেকোনো উদ্বৃত্ত শেষ পর্যন্ত দরিদ্র সদস্যদের কল্যাণেই ব্যবহৃত হবে।
সিডিএফের দাবি, এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের আইন থাকলেও সেগুলো মূলত মুনাফাভিত্তিক। সে তুলনায় বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক একটি ব্যতিক্রমী ও উন্নত ধারণা নিয়ে আসছে, যেখানে সামাজিক উন্নয়নই হবে প্রধান লক্ষ্য। সংগঠনটির মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে তা দেশের ক্ষুদ্রঋণ খাতের পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিসরেও একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

