১৩ জানুয়ারী ২০২৬, মঙ্গলবার, ০৭:২৭:৪৩ পূর্বাহ্ন
ইরানের এবারের বিক্ষোভ কেন নজিরবিহীন?
  • আপডেট করা হয়েছে : ১২-০১-২০২৬
ইরানের এবারের বিক্ষোভ কেন নজিরবিহীন?

ইরানের সরকারবিরোধী আন্দোলন এক নতুন ও অভূতপূর্ব পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ৪৭ বছরের ইতিহাসে এমন ব্যাপক, সমন্বিত ও সরাসরি সরকার উৎখাতের দাবিতে আন্দোলন আগে কখনো দেখা যায়নি। দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর দমন-পীড়নের মুখে বিক্ষোভকারীদের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জবাবে ইরান ওই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ ও সহযোগীদের ওপর হামলার হুমকি দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বিক্ষোভের বিস্তার, দাবি ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট একে আগের সব আন্দোলন থেকে আলাদা করেছে।

দেশজুড়ে নজিরবিহীন বিস্তার

বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর ভৌগোলিক ব্যাপ্তি। সমাজবিজ্ঞানের গবেষক এলি খোরসান্দফার জানান, বড় শহরগুলোর পাশাপাশি এমন সব ছোট শহরেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, যেগুলোর নাম অনেকেই আগে শোনেনি।

ইরানে এর আগেও একাধিক বড় আন্দোলন হয়েছে। ২০০৯ সালের ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ ছিল মূলত মধ্যবিত্তনির্ভর এবং বড় শহরকেন্দ্রিক। ২০১৭ ও ২০১৯ সালের আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিল দরিদ্র এলাকাগুলোতে। ২০২২ সালে মাহশা আমিনির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লেও এবারের আন্দোলনের বিস্তার ও ধারাবাহিকতা আরও গভীর।

অর্থনৈতিক ক্ষোভ থেকে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবি

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের ভয়াবহ দরপতনকে কেন্দ্র করে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে বাজার ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের মাধ্যমে এবারের আন্দোলনের সূচনা হয়। খুব দ্রুতই তা ইরানের পশ্চিমাঞ্চলসহ বিভিন্ন গরিব ও মধ্যবিত্ত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

খোরসান্দফার বলেন, শুরুতে এটি অর্থনৈতিক ক্ষোভের আন্দোলন মনে হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা পুরো শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভিন্ন দাবিতে রূপ নেয়। লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’ স্লোগান দিতে শুরু করে এবং সরাসরি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনি ও তার সরকারের অপসারণ দাবি তোলে।

পাহলভি ফ্যাক্টর ও নেতৃত্বের ইঙ্গিত

এবারের আন্দোলনে আগের তুলনায় কিছু পরিচিত বিরোধী মুখের উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলেন নির্বাসনে থাকা ইরানি নেতা রেজা পাহলভি, যাঁর পিতা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত হন।

বিশ্লেষকদের মতে, পাহলভির প্রভাব থাকলেও এটি রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত নয়। বরং ইসলামী শাসনের বিকল্প কোনো স্পষ্ট ও ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃত্বের অভাব থেকেই তার প্রতি সমর্থনের একটি ছায়া তৈরি হয়েছে। বড় শহরগুলোতে বিক্ষোভের তীব্রতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, তার আহ্বান কিছুটা হলেও বিক্ষোভকারীদের উদ্বুদ্ধ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য সমর্থন

এবারের আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন জানিয়েছেন এবং দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়ার হুমকি দিয়েছেন—যা ইরানের আগের কোনো আন্দোলনে দেখা যায়নি।

২০০৯ সালের আন্দোলনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের নিরব ভূমিকা নিয়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পরবর্তীতে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। তবে এবার হোয়াইট হাউজের অবস্থান অনেক বেশি সরাসরি।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দাবি করেছেন, এই বিক্ষোভ বিদেশি শক্তির মদদে পরিচালিত। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের বন্ধু এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কম।

আঞ্চলিক দুর্বলতা ও যুদ্ধের প্রভাব

সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন, লেবাননে হেজবুল্লাহর দুর্বলতা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাত ইরানের আঞ্চলিক অবস্থানকে নড়বড়ে করেছে। ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পরই এই আন্দোলন জোরালো হয়।

সাংবাদিক আব্বাস আবদি মনে করেন, এই যুদ্ধ সরকারকে জাতীয় সংহতি গড়ার সুযোগ দিয়েছিল, কিন্তু সরকার তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক আঘাতে ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরের মর্যাদা সাধারণ মানুষের চোখে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ভয়ের দেয়াল ভাঙার দাবি

খোরসান্দফার বলেন, এবারের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো মানুষের মানসিক অবস্থান। বিশেষ করে রাস্তায় নামা নারীরা বলছেন, দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের ভয় কাটিয়ে ওঠাই তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।

সবমিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান আন্দোলন শুধু একটি প্রতিবাদ নয়—এটি রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তিকেই চ্যালেঞ্জ করছে, যা দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

শেয়ার করুন